প্রসাদ দাস : ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন এক প্রতিভাধর সংগীত শিক্ষক। প্রতিটি মানুষের ভেতর প্রতিভা লুকিয়ে রয়েছে। কেননা আল্লাহ মানুষকে প্রতিভা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। মানুষ তার সাধনা দিয়ে সেই প্রতিভাকে সৃষ্টিশীল কাজে নিয়েজিত করে। মন ও দেহকে পূতপবিত্র রেখে সাধনা করতে পারলে আরাধ্য বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ মনেপ্রাণে এ কথা বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি তার শিষ্যদের এক মনে, এক ধ্যানে সাধনার উপদেশ দিতেন। সংগীতের এ সাধনার প্রথম স্তর ছিল ‘স্বর সাধনা’।
আলাউদ্দিন খাঁ শুরুতেই শিষ্যদের একসঙ্গে কণ্ঠ এবং যন্ত্র উভয়বিদ সংগীতের তালিম দিতেন। কণ্ঠে স্বর সাধনার সঙ্গে যন্ত্রের রেওয়াজ একটানা তিন বছর চলত। পাল্টা, মীড়, গমক, বোল, লারিতান, একহারা তান, সপাট তান, ঝালা, কৃন্তন, স্পর্শ এবং মূর্ছনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেখাতেন। কারণ এগুলোই মূলত ‘স্বর সাধনা’র বুনিয়াদ।
স্বর সাধনার পর তিনি রাগ-রাগিণীর তালিম শুরু করতেন। সকাল, দুপুর আর সন্ধ্যাকালের জন্য কিছু রাগ নির্দিষ্ট করা ছিল। সকালে ভৈরবী, দুপুরে কাফী এবং সন্ধ্যাকালের জন্য ইমন রাগ। প্রচলিত ১০টি ঠাটের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাগের তালিম দিতেন। এসব রাগ ‘বোলের’ সাহায্যে শেখাতেন। যেমন ডা, রা, ডিরি, ডারা, ডা ইত্যাদি। মীড় শেখানোর সময় কৃন্তন, গমক ইত্যাদির তালিম দিতেন। এসব তালিম চলত কয়েক বছর ধরে। সরগম দিয়ে শুরু করে পরে গৎ শেখাতেন। এগুলো মুখস্থ হয়ে গেলে তারপর শুরু হতো কণ্ঠসংগীতের অনুশীলন। কণ্ঠে সঠিকভাবে ধারণ করা হলে যন্ত্রসংগীতের তালিম শুরু হতো। এভাবে পদ্ধতিগত শিক্ষায় বছরের পর বছর কেটে যেত।
প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায় শেষ হয়ে গেলে আলাউদ্দিন নিজের কণ্ঠে গাইতেন এবং যন্ত্রে বাজাতেন। শিষ্যরা তাকে অনুসরণ করত। এতে তিনি শিষ্যদের জ্ঞানের গভীরতা পরীক্ষা করতে পারতেন। ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি হলে তিনি তা শুধরিয়ে দিতেন। তবে বড় ধরনের ভুল হলে বেশ রেগে যেতেন। তিরস্কার করতেন। কেননা তিনি ভীষণ কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। ভুল হলে ভাবতেন শিষ্যের অমনোযোগের কারণেই ঘটেছে। আর অমনোযোগ ছিল তার নিকট ক্ষমাহীন অপরাধ। অমনোযোগী হওয়ার কোনো পথ ছিল না। স্বর এবং সুরের প্রতিটি খুঁটিনাটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি শিষ্যদের শেখাতেন। ফলে শ্রুতি, চলন, বাদী, সমবাদী ইত্যাদি সম্পর্কে শিষ্যদের জ্ঞান পাকাপোক্ত হয়ে যেত। আলাউদ্দিন খাঁর শিক্ষার আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে সব শিষ্যের তালযন্ত্র শিক্ষা ছিল আবশ্যিক। নানা ধরনের তাল শেখাতেন। দেরি, আড়ি, সওয়াই, ঝুলনা, সম, বিষম, অতীত, অনাঘত প্রভৃতি তাল ও লয়ে আলাউদ্দিনের শিক্ষাগুণে অচিরেই শিষ্যের দল দক্ষ হয়ে উঠত।
তাল শিক্ষাদানের সময় তবলার ‘বোলের’ সুন্দর অর্থ করেছিলেন তিনি। আর এ বোলগুলোর অর্থের মধ্যেই তার শিক্ষা পদ্ধতির অন্তর্গূঢ় দিকনির্দেশনা নিহিত ছিল। ত্রিতালের বোলের অর্থ তিনি এভাবে করেছিলেন: না ধিন ধিন না- বৈঠনা, না ধিন ধিন না- বোলনা, না তিন তিন না (করুণা), না ধিন ধিন না (জান-না)। তার মানে হলো, প্রথমে গুরুর সামনে কেমন করে বসতে হয় তা জানতে হবে, পরে গুরুর সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় তা শিখতে হবে, এরপর গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত তালিম কীভাবে রেওয়াজ করতে হয় তা জানতে হবে এবং সবশেষে সংগীতের গূঢ় অর্থ এবং নিজেকে জানতে হবে। আলাউদ্দিন খাঁর এ পদ্ধতি শিষ্যদের শিক্ষাদানের বেলায় খুব কার্যকরী হয়েছিল।

তারপর শুরু হতো গতের তালিম। বিভিন্ন তালে গৎ শেখাতেন। ধামার, ঝাঁপতাল, ত্রিতাল ইত্যাদির জন্য তান, তোড়া, লয়কারীসহ পৃথক পৃথক গৎ শেখাতেন। শিষ্যদের সঙ্গে আলাউদ্দিন নিজেই তবলা বাজাতেন। তার সঙ্গে শিষ্যদের ‘লরন্ত’ অভ্যাস করতে হতো। ফলে শিষ্যদের প্রশিক্ষণের ভিত্তিভূমি মজবুত হতো।
সবশেষে তিনি শিষ্যদের আলাপের তালিম দিতেন। আলাপ শিক্ষাদানের ব্যাপারে তিনি খুবই গুরুত্ব আরোপ করতেন। কারণ সংগীতের সব রসই এ আলাপে নিহিত। সঠিকভাবে আলাপ না করতে পারলে রাগের রূপ প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। তিনি আলাপ শেখানোর সময় শিল্পের ‘নব-রস’ সম্পর্কে শিষ্যদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। তবে তিনি করুণ রস, শৃঙ্গার রস এবং বীর রসের প্রতিই বিশেষ জোর দিতেন। আলাপের শুরুতে করুণ রসের প্রাধান্য ছিল। তারপর জোড়, ঝালাতে শৃঙ্গার রস এবং বীর রস পরিবেশনের মাধ্যমে আলাপের সমাপ্তি ঘটত।
আলাউদ্দিন খাঁর কাছে পদ্ধতিগতভাবে শিক্ষা লাভ করতে শিষ্যদের কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। প্রতিদিন একটানা ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা রেওয়াজের ভেতর তাদের নিবদ্ধ থাকতে হতো। কারণ আলাউদ্দিন তাদের শুরুতেই মন্ত্র দিতেন, সাধনা ছাড়া সিদ্ধি লাভ হয় না।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যন্ত্রসংগীতের ভুবনে এক আমূল পরিবর্তন আনেন। রবাব, বীণা, সুরশৃঙ্গার, সেতার আর সুরবাহার যন্ত্র বাজানোর আঙ্গিকে সরোদের রীতি প্রচলন করেন। তিনি শুদ্ধ ‘ডারা ডারা’ এবং ‘রাডা রাডা’ বাজাবার পদ্ধতি উদ্ভাবন করে সংগীতে এক অভূতপূর্ব বাজ প্রচলন করেন। একটি যন্ত্রের বাজানোর ঢঙ বিভিন্ন যন্ত্রে সংযোজন করার চিন্তা আলাউদ্দিনের আগে কোনো সংগীতজ্ঞ করেননি। তার এ আবিষ্কারে সংগীত ভুবনে এক আলোড়নের সৃষ্টি হলো।
আলাউদ্দিন তার গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে ধ্রুপদ আর ধামারের বিভিন্ন ঢঙের কলাকৌশল শিখেছিলেন। মধ্যযুগ এবং পরবর্তীকালের সংগীতজ্ঞরা সংগীতের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন; কিন্তু আলাউদ্দিন ছিলেন সংগীতের সর্বক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। তিনি সংগীত পরিবেশনের আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তার উদ্ভাবিত নতুন আঙ্গিকের সংগীতকে দেশে এবং বিদেশে জনপ্রিয় করে তোলেন তার দুই শিষ্য পুত্র আলী আকবর খাঁ, জামাতা রবিশঙ্কর।
আলাউদ্দিন খাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নতুন ‘বাজ’ সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অনেকগুলো তাল সৃষ্টি করেন। তার সৃষ্ট তালগুলোর মধ্যে মোহন তাল (সাড়ে তিন মাত্রা), রাজবেশ তাল (সাড়ে চার মাত্রা), উদয়সিংহ তাল (সাড়ে পাঁচ মাত্রা), বিজয় তাল (সাড়ে ছয় মাত্রা), বিজয়ানন্দ তাল (সাড়ে সাত মাত্রা), উপরাল তাল (সাড়ে আট মাত্রা), বিক্রম তাল (সাড়ে নয় মাত্রা), লঘুকির তাল (সাড়ে দশ মাত্রা), রঙ তাল (সাড়ে এগারো মাত্রা), রঙবরণ তাল (সাড়ে বারো মাত্রা), রঙরায়াত তাল (সাড়ে তেরো মাত্রা), অভিনন্দন তাল (সাড়ে চৌদ্দ মাত্রা) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আলাউদ্দিন খাঁর প্রিয় রাগগুলো ছিল ইমন, হেমন্ত, হেম-বেহাগ, তিলকামেছ, শ্রী, বিলাবল, দরবারী, শুদ্ধ বসন্ত, পুরিয়া ধানেশ্রী, শুদ্ধ ভৈরবী এবং শুদ্ধ কল্যাণ।
আলাউদ্দিন খাঁর আরো দুটো অবদান হলো ‘মাইহার স্ট্রিং ব্যান্ড’ সৃষ্টি এবং ‘মাইহার মিউজিক কলেজ’ প্রবর্তন। মধ্য প্রদেশের সাতনা জেলার একটি অপরিচিত করদ রাজ্য মাইহার। জনকোলাহল থেকে বহু দূরে একটা পাহাড়িয়া শহর মাইহার। মহারাজ বৃজ নারায়ণ সিংহ এ রাজ্যের শাসনকর্তা। সংগীতে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তার গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। আলাউদ্দিন খাঁ ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র সমন্বয়ে তৈরি করলেন একটি বৃন্দবাদ্যের দল। নাম রাখলেন ‘মাইহার স্ট্রিং ব্যান্ড’। প্রায় ৪০ জন শিল্পী এ দলে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। তাদের সবাই আপন আপন বাদ্যযন্ত্র বাদনে পারদর্শী ছিলেন। সবাই পৃথকভাবে আলাউদ্দিন খাঁর কাছে শিখতেন। ভারতীয় যন্ত্রসংগীতে আলাউদ্দিন প্রথম বৃন্দবাদনের প্রবর্তন করেন।
সপ্তাহের প্রতিদিন বাদ্যযন্ত্রীদের রেওয়াজ আর অনুশীলন চলত। কোনো কথাবার্তা নেই। নীরবে যার যার যন্ত্র রেওয়াজে নিমগ্ন থাকতেন। ফলে সমবেতভাবে যখন তারা ঐকতান পরিবেশন করতেন তখন সুরের অনুরণনে পরিবেশ উঠত ভরে। ঐকতান শুরু হতো ‘তিলকামোদ’ রাগ দিয়ে। তারপর ‘ভৈরবী’ রাগের সংমিশ্রণে গৎ পরিবেশিত হতো। আলাউদ্দিন খাঁ ঐকতান রচনা করতেন। এ বৃন্দবাদনে হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, সরোদ, এসরাজ, বেহালা, নল তরঙ্গ ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো। ১৯২৫ সালে লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে সর্বপ্রথম জনসাধারণ্যে ঐকতান বাজিয়ে মাইহার স্ট্রিং ব্যান্ড প্রভূত সুনাম অর্জন করে। আলাউদ্দিন খাঁ স্বয়ং এ ঐকতান পরিচালনা করেন। এ বৃন্দবাদন প্রবর্তনের ফলে সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানি মাইহার স্ট্রিং ব্যান্ডের ঐকতান রেকর্ড বের করে।
মহারাজ বৃজনারায়ণ অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। শিল্প, সংগীত ও সংস্কৃতির উন্নয়নে তিনি অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন তেমনি এক সংস্কৃতিসেবক মহারাজার সভাসংগীতজ্ঞ ও রাজ-গুরু। আলাউদ্দিন খাঁ মাইহারের একটি সংগীত কলেজ প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। মহারাজার কাছে তার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি তাকে উৎসাহিত করেন। আলাউদ্দিন প্রচুর পরিশ্রম করে মাইহারে একটি মিউজিক কলেজ স্থাপন করেন। এ কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতা করেন মাইহারের মহারাজা এবং বিন্ধ্য প্রদেশ সরকার। কলেজের নাম রাখেন ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’।
কয়েকটি অতিথিশালায় প্রথম এ কলেজের সংগীত শিক্ষার কাজ শুরু হয়। হোস্টেলের ব্যবস্থাও ছিল। দূরদূরান্ত থেকে আগত সংগীত শিক্ষার্থীরা সেখানে থাকতেন। কলেজের জন্য পরে দালান তৈরি করা হয়। সংগীত শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে শিক্ষা দেয়া হতো। কলেজে পাঁচ বছর মেয়াদি কোর্স চালু ছিল। পাঁচ বছর শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার্থীদের ‘ব্যাচেলর অব মিউজিক’ সনদ প্রদান করা হতো। আলাউদ্দিন খাঁর প্রচেষ্টায় কলেজটি মধ্য প্রদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। কলেজের প্রতি বিভাগের জন্য অভিজ্ঞ সংগীতজ্ঞ রাখা হতো। আর আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন কলেজের সর্বেসর্বা পরিচালক।
[ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর তৃতীয় পুত্র মোবারক হোসেন খান রচিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ: জীবনী ও পত্রসম্ভার বইয়ের নির্বাচিত অংশ।

