একাত্তর বাংলা রির্পোটঃ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমরা রাজনীতি করি, আমরা বাংলাদেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। আজকে এই যে নির্বাচনী জনসভা। এই নির্বাচনী জনসভায় আমরা কি দেখি, অন্য লোক এসে বিভিন্ন অপপ্রচার চালায়। আজকে এখানে দাঁড়িয়ে অন্য দলের গীবত করি, তাহলে কি জনগনের কোন লাভ হবে ? বরং ক্ষতি হবে। কারণ জনগন তাকেই ভোট দিবে, যে জনগনের জন্য কাজ করে। বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামীতে তারা দেশকে কিভাবে পরিচারনা করবে। এই দলটির অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হয়, বিএনপি দলটিই জানে জেলা ও উপজেলা বা গ্রামে গ্রামে কিভাবে উন্নয়ন ও রাস্তাঘাট করতে হয়। বিএনপি নামক দলটিই জানে দেশের মানুষকে কীভাবে নিরাপত্তা দিতে হয়, বিএনপি নামক দলটির অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিভাবে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হয়।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে ময়মনসিংহ নগরীর সার্কিট হাউস মাঠে আসন্ন ত্রযোদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বেলা ৪টা ৩ মিনিটে স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানসহ মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। পরে ৪টা ২৬ মিনিটে উপস্থিত জনতাকে সালাম জানিয়ে বক্তব্য শুরু করে ৪টা ৫২ মিনিটে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে বক্তব্য শেষ করেন তারেক রহমান।
জনসভায় তারেক রহমান উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন একটি রাজনৈতিক দল, যারা এখন পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তাদের দাবি, বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন হলো- ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে ওই দলটিরও দুইজন সদস্য (মন্ত্রী) ছিলেন। বিএনপি যদি এতোই খারাপ হতো, তবে তারা কেন তখন পদত্যাগ করে চলে আসেননি ? এজন্য পদত্যাগ করেনি- তারা জানতো খালেদা জিয়া কঠোর হস্থে দুর্নীতি দমন করছেন এবং তারা ভালো করেই জানতেন খালেদা জিয়া দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়নি। সব ধরণের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলে খালেদা জিয়ার সময় যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে তার সময় দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল।
এ সময় বক্তব্যের মাঝপথে তারেক রহমান ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থীদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, আমরা চাই আমাদের দেশের ভাই বোনেরা শিক্ষিত হোক। আমরা চাই তারা স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরাও সমান সংখ্যক হয়ে পাশাপাশি লেখাড়া করুক। আমরা যদি সমগ্র দেশের জনসংখ্যা দেখি, তাহলে দেশের অর্ধেক নারী ও অর্ধেক পুরুষ। কিন্তু আমরা অর্ধেক জনসংখ্যা নিয়ে সামনে যেতে চাই, তাহলে যেতে পারবো না। সুতরাং নারীদের সাথে নিয়ে আমাদের সামনে যেতে হবে, তাদের সাথে নিয়ে এগুতে হবে। তাই আমরা গৃহিণীদের ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি, যাতে ফ্যামেলি কার্ডের সুবিধা প্রত্যেকটি পরিবার পায়। যাতে করে তারা কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্যে দিন অতিবাহিত করতে পারে।
জনসভায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের মৎস চাষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি ময়মনসিংহের মৎস চাষিদের কথা বলেছি, একটু হলেও যেন তারা সুবিধা পায়, শুধু মৎস চাষিদের জন্য নয়, কৃষকদের কৃষি কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষি কার্ড দেয়ার একমাত্র কারণ- কৃষক ভাল থাকলে বাংলাদেশর মানুষ ভাল থাকবে। আমরা কৃষক ভাইদের সহযোগীতা করতে চাই, কৃষক ভাইদের পাশে থাকতে চাই। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে যেন আমরা প্রয়োজনীয় স্যার ও কীটনাশক দিতে পারি।
ময়মনসিংহ বিভাগের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি জানি ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। নদী ভাঙন সমস্যা, কর্মসংস্থান সমস্যা, জেলাগুলোর বিভিন্ন উপজেলাতে সেতু, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, এগুলোর সমস্যা রয়ে গেছে। যে গুলো গত একযুগে সংস্কার, মেরামত, তৈরীর প্রযোজন ছিল। যা বিগত সরকার করেনি। এই সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার প্রয়োজন ছিল কিন্তু হয়নি। কারণ জনগনের ভোটের অধিকার ছিল না। নিশি রাতের নির্বাচন হয়েছিল তথাকথিত নির্বাচন। যেখানে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি ছিল না। তাই দেশের যুবক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়নি। তাই এলাকার মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।
জনসভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বিএনপির পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ড চালুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আজ আমরা সকলে একত্রিত হযেছি। এই দেশের মানুষ, তাদের যে অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। যে অধিকারের জন্য গত ১৬ বছর গুম, খুন অত্যাচার, নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। যে অধিকারের জন্য ২০২৪ সালে জুলাই আগস্টে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছে। সেই অধিকার আগামী মাসের ১২ তারিখে প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন ইনশা-আল্লাহ। কি সেই অধিকার ? ভোটের অধিকার। কেন এই ভোটের অধিকার দরকার ? কারণ আমরা চাই এই দেশের মালিক যে জনগন, তাদের সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। যাতে জনতার ইচ্ছামত সামনে চলতে পারে। সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটনোর জন্যই ভোটের অধিকার। মানুষের কথা বলার অধিকার, মানুষের ন্যায্য অধিকার, যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, এ জন্যই দরকার ভোটের অধিকার।
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। উপজেলা হাসপাতাল বলুন বা জেলা হাসপাতালই বলুন, যে ওষুধ, চিকিৎসা ও চিকিৎসক দেওয়ার কথা, তা দেওয়া হয়নি। যে কারণে গ্রামগঞ্জের মানুষ সঠিক চিকিৎসা পায়নি। প্রিয় ভাই ও বোনেরা বাংলাদেশের মানুষ একজন অভিবাবক চায় এবং তাদের সন্তান যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়। একজন অভিবাবক চায়, তার সন্তান যেন সেই শিক্ষা পাক, যে শিক্ষাগ্রহণ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে, বেকার থকবে না।
এ সময় যুব সমাজের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, তরুণরা-যুবকরা কি চায় ? তারা চায় দেশে কর্মসংস্থান হবে। দেশে মিল ফ্যাক্টরি হবে, ব্যবসা বাণিজ্য হবে, যাতে করে সুন্দরভাবে নিরাপদে ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকরি করতে পারবে। মানুষ অসুস্থ হতেই পারে, হওটাই স্বাভাবিক, অসুস্থ হলে যেন মানুষ চিকিৎসা পায়। আমরা যদি ময়মনসিংহের কথা বলি, এখানকার কৃষক ভাইদের অনেক সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে মাছের পোনা চাষ। এটি আরও বড় করে করা যেত কিন্তু তা করা হয়নি। এগুলো আমাদের পরিকল্পনার মাঝে রয়েছে, কিভাবে এই মাছের পোনা চাষ করে দেশ এবং বাহিরে পাঠানো সম্ভব হয়।
জনসভায় মাদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা জানি ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা, শেরপুরে ব্যাপক মাদক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু মাদক সমস্যা সমাধান কিভাবে করবেন ? মাদক সমস্যা দূর করতে হলে তরুণ, যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মানুষ যখন কাজে থাকবে তখন মানুষ এগুলোতে যাবে না। আমরা সেই পরিবেশ করতে চাই।
তরুণদের আইটি প্রশিক্ষণ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা দেশে আইটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব। যেখানে তরুণরা কর্মসংসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, যারা আইটিতে কাজ করে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের আইটি ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনা করছি। যাতে তারা আইটিতে কাজ করে ঘরে বসে আয়-রোজগার করতে পারে।
এ সময় খাল খনন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ময়মনসিংহ অন্যতম কৃষিপ্রধান এলাকা, এখানে এক সময় অনেক খালবিল ছিল। এখন এই খাল-বিলগুলো সব ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো আমরা পুর্ণখনন করতে চাই। এখন এসব খাল-বিল পুর্নখননের জন্য কে কে কোদাল হাতে নিবেন ? আগামী ১২ তারিখের পর আমি আপনারা কোদাল হাতে নিয়ে আসবেন, আমি কিন্তু থাকব আপনাদের সাথে। এই দেশের মঙ্গলের সাথে আপনাদের সামনে কতগুলো কথা বললাম। এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে কম-বেশি সক্ষম হওয়ার জন্য আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। তাহলে আমরা সফল হবো ইনশাল্লাহ।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক ও ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনের প্রার্থী জাকির হোসেন বাবলু। এ সময় সভাটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ময়মনসিংহ- ৪ (সদর) আসনের আবু প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন।
এ সময় মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জোবায়দা রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো: শরীফুল আলম, কোষাধক্ষ রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ওয়ারেস আলী মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তারেক রহমানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার শামস, আমরা বিএনপি পরিবারের আহবায়ক আতিকুর রহমান রুমন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসাইন, ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া) আসনের প্রার্থী আকতারুল আলম ফারুক, ময়মনসিংহ-৭ আসনের ডা: মাহাবুবুর রহমান লিটন, ঈশ্বরগঞ্জ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, নান্দাইলের প্রার্থী ইয়াসের খান চৌধুরী, গফরগাঁওয়ের প্রার্থী আখতারুজ্জামান বাচ্চু, ভালুকা আসনের প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুসহ ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলার (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর এবং নেত্রকোনা) ২৪টি সংসদীয় আসনের দলীয় প্রার্থীরা।
এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আফজাল এইচ খান, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আলমগীর মাহমুদ আলম, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী, একেএম মাহাবুবুল আলম, শামীম আজাদ, দক্ষিণ জেলার যুগ্ম আহবায়ক শহীদুল আমিন খসরুসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এদিকে দুপুর আড়াইটায় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তারেক রহমান মঞ্চে আসেন বেলা ৪টা ৩ মিনিটের দিকে। তবে মঞ্চে উঠার আগে তিনি সমাবেশস্থলের পাশে উপস্থিত থাকা স্বৈরাচারবিরোধী এবং জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে কুশল বিনিময় করেন। পরে তিনি মঞ্চে উঠে তিনদিক ঘুরে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর টানা ২৬ মিনিট তিনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন।

