সুমন ভৌমিকঃ মুক্তাগাছা পৌরসভার সামনে সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ শহরতলী রহমতপুর বাইপাস প্রায় ২০ কিলোমিটার। সড়ক ও জনপদ এইটুকু সড়কে ৫টি পয়েন্টে ৫টি রশিদ এর বিপরীতে ৩শ টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে প্রতিটি গাড়ী থেকে। যার উদাহরন স্বরুপ ৪ ফেব্রুয়ারী একটি গাড়ি থেকে আদায়কৃত চাঁদার ৫টি রশিদ এর কপি পুলিশ প্রশাসনের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পথে পথে অবৈধ চাঁদাবাজির প্রমান এটি। এছাড়াও বিবিধ রশিদে চাঁদাবাজী হয়।
জানা যায়, শ্রমিক ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দরা চাঁদা আদায়ের জন্য লোক নিয়োগ করে রেখেছেন মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহ সদরে। চাঁদা আদায়ের নামে নৈরাজ্য চলছে প্রতিদিন, প্রতিরাত অবিরাম চলে চাঁদা আদায়ের সার্বক্ষণিক ডিউটি। প্রতিদিন, প্রতিরাত শত শত যানবাহন থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদা আদায় করা হয়।
বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ, মুক্তাগাছা থেকে সদরে রহমতপুর রোডে প্রতিদিন-প্রতিরাত শত শত যানবাহন থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে অবাধে। ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন ও মুক্তাগাছা উপজেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়ন বিভিন্ন রশিদ দিয়ে চাঁদা সংগ্রহে এখন বেপরোয়া জোর-জুলুমের চালাচ্ছে। মুক্তাগাছায় চাঁদা আদায়ে গাড়ি আটক, ভাঙচুর, চালককে মারধরের ঘটনাও অহরহ ঘটেছে।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের সড়কে চাঁদা নিচ্ছে মুক্তাগাছা পৌরসভার ইজারাদার ও ট্রেড ইউনিয়ন মুক্তাগাছা টার্মিনাল টুল, মুক্তাগাছা পৌর টুল এর নামে এবং মুক্তাগাছা উপজেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি: নং-৫২৭, দুঃস্থ, বেকার, পঙ্গুত্ব, বয়স্কদের সাহাযার্থে শ্রমিক কল্যাণ চাঁদা আদায়ে তাদের বিভিন্ন রশিদ ছাঁপানো রয়েছে। ঢালাও ভাবে এগুলোর ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, মুক্তাগাছা আলাদা ট্রেড ইউনিয়ন এবং ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়নের আওতায় নয় ।
এ দিকে মুক্তাগাছা ট্রাফিক পুলিশ, এই বেপরোয়া চাঁদাবাজির কথা অস্বীকার করেননি। পুলিশ জানায়, সবকিছুই হচ্ছে প্রকাশ্যে। স্থানীয় ট্রাফিকের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে একটি মাত্র শব্দে ‘বিপদে আছি’। বেআইনী চাঁদা আদায়ের দৌরাত্ম্যে বেড়েই চলেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, ২০, ৩০, ৫০, ১০০ টাকা হারে ৩শ টাকা চাঁদা আদায় করা হয় মুক্তাগাছা থেকে ময়মনসিংহ সদরে রহমতপুর বাইপাস পর্যন্ত। বাস, ট্রাক, মিনিবাস, মিনি ট্রাক, ম্যাক্সি, পিকআপ, ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস, অটো-টেম্পু, অটো-রিকশা, সিএনজি, ট্রলি, লরী, ভটভটি, নছিমন, করিমন সহ সকল যাত্রী ও মালবাহী গাড়ি থেকে দৈনিক ১ বার চাঁদা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিদিন অবৈধ ভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা। তাদের আবার রয়েছে নামে-বেনামে অনেকগুলো গাড়ি ও বাড়ি। দুদক সঠিক তদন্ত করলে সব কিছুই বেড়িয়ে আসবে। এ ব্যাপারে ব্যাপক তথ্য রয়েছে।
মুক্তাগাছা পৌর টুল ও মুক্তাগাছা টার্মিনাল টুল এর রশিদে ইজারাদার ‘সরকার জাহাঙ্গীর’ এর নাম ছাঁপা রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত হারে চাঁদা আদায় চলছে দৈনিক। মুক্তাগাছা পৌর ও টার্মিনাল টুল বাবদ ১২০ টাকা ও মুক্তাগাছার দুঃস্থ, বেকার, পঙ্গু, বয়স্ক শ্রমিকদের সাহায্যের নাম ভাঙ্গিয়ে ৫০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। দুঃস্থ ও পঙ্গু শ্রমিক কল্যানে ভাগ বন্টন করা হয়। এই সবই টাকা যাচ্ছে শ্রমিক ইউনিয়ন কতিপয় প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। ফলে তারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। শুধু মুক্তাগাছা থেকে রহমতপুর বাইপাস নয় জেলা ব্যাপী বিভিন্ন রুটে চলছে অবৈধ চাঁদাবাজি।
ময়মনসিংহ মটর মালিক সমিতির কোচ বিভাগের সাধারণ সম্পাদক বিকাশ সরকারকে মুক্তাগাছা ও সদরে বাইপাস রোডের চাঁদাবাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো অবৈধ। ইতিপূর্বে এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেন। চাঁদাবাজরা ধর-পাকড়ের মুখে পড়ে।
মুক্তাগাছা পৌর টুল বাবদ ১শ টাকা চাঁদা আদায়ের রশিদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তাগাছার মেয়র শহীদুল ইসলাম জানান, শুধু বাসস্ট্যান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে পৌর টুল আদায়ের জন্য বার্ষিক ইজারা দেয়া হয়। তবে সেক্ষেত্রে ১০ টাকা আদায় করার কথা। রশিদে ১০০ টাকা লেখার কথা শুনেই মেয়রের কন্ঠে অনেকটা বিষ্ময় ফুটে উঠে।
এ দিকে, ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন রেজি: নং-৪৬৯ দৈনিক শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বাবদ ৩০ টাকা ও ময়মনসিংহ জিলা মটর মালিক সমিতি ও ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন যৌথ সার্ভিস চার্জ বাবদ ১০০ টাকা করে বাইপাস থেকে যে চাঁদা আদায় করা হয় তা অনুমোদিত বলে ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি নজরুল ইসলাম প্রতিবেদকে জানান।
অপর দিকে জিলা মটর মালিক সমিতির মহাসচিব মাহাবুবুর রহমান এই প্রতিবেদকে জানান, ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন রেজি: নং-৪৬৯ দৈনিক শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বাবদ ৩০ টাকার রশিদটি বৈধ এবং তা যৌথ সভায় পাশ করা হয়েছে কিন্তু জিলা মটর মালিক সমিতি ও ময়মনসিংহ জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন যৌথ সার্ভিস চার্জ বাবদ ১০০ টাকার রশিদটি সম্পূর্ণ অবৈধ।
জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, সড়কে অবৈধভাবে যারা চাঁদা আদায় করছে তা বন্ধ হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে ফেডারেশনের সভায় তারা স্বিদ্ধান্ত নিবেন। তিনি মুক্তাগাছা ট্রেড ইউনিয়ন সমন্ধে বলেন, ওরা জোরজুলুম করে চাঁদা আদায় করে। চাঁদা না দিলে গাড়ি ভাংচুর, গাড়ির গ্লাস ভাংচুর এবং ড্রাইভারদের মারধর করে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আলাদা ট্রেড ইউনিয়ন গুলোর জেলা মটরযান কর্মচারী ইউনিয়নের সাথে কোন ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। জোর জবরদস্তি করে অবৈধ চাঁদাবাজি চলতে পারে না। সড়কে-মহাসড়কে অবৈধ ভাবে চাঁদা আদায় বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে জরুরী ব্যবস্থা নেয়ার সময় এসেছে।
তিনি প্রশাসনকে দোষারোপ করে বলেন, নান্দাইল চৌরাস্তা হাইওয়ে পুলিশ, তারাকান্দা, ফুলপুর এলাকায় চাঁদার জন্য পুলিশের প্রতিনিয়ত চাপে চালকদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এসব দিকেও প্রশাসনের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহ সদরে বিভিন্ন রশিদ দিয়ে চাঁদা আদায় করে মটর শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের নিয়োজিত কর্মীরা কিন্তু রশিদ দিয়ে চাঁদা আদায়ের এই কার্যক্রই প্রশাসন ইতিপূর্বে অবৈধবলে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন নামে-বেনামে সড়কে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিপূর্বে জেলা পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। একাধিক চাঁদা আদায়কারীকে ঘটনাস্থল হতে আটক করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো অবৈধ চাঁদাবাজি। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ নজির সৃষ্টি করলেও তা ছিলো ক্ষণস্থায়ী। রহস্যজনক কারনে ফের চাঁদা আদায়ের তৎপরতা চালু হতে বেশি সময় লাগেনি।
পরিবহন সেক্টরের এ ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজি সব সময় থাকে নিয়ন্ত্রনের বাইরে। চালক ও গাড়ির মালিকরা চাঁদাবাজ চক্রের কাছে দিশেহারা ও জিম্মি। সড়কে অবৈধ চাঁদাবাজীর মাধ্যেমে মহল বিশেষ প্রতিমাসে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সড়কের অবৈধ টাকায় অনেকেই গড়ে তুলেছে টাকার পাহাড়। আর চাঁদাবাজি চালিয়ে যেতে হুমকি কে হাতিয়ার করে রাখছেন। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির নৈরাজ্যে প্রশাসন ইতিমধ্যে বন্ধ করেছিল। কিছুদিন পর আবার অবৈধ বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করে। তবে চালক ও গাড়ির মালিকরা মনে করেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তৎপর হলে এই চাঁদাবাজদের দৌড়াত্ব বন্ধ করা সম্ভব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযোগকারী বলেন, চাঁদাবাজ, দূর্নীতি ও সড়কে নৈরাজ্যে বন্ধে জেলা পুলিশের জিরো টলারেন্স জরুরী।

