একাত্তর বাংলাঃ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনদিনের সফরে কক্সবাজার আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে অনুষ্ঠিতব্য এ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বুধবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৈরি তালিকাভুক্ত ও চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিমান যোগে কক্সবাজার পৌঁছবেন বলে জানান এসপি।
জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য মতে, এরই মধ্যে অন্তত দেড় শতাধিক তালিকাভুক্ত ও চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজারের বিশেষ একটি স্থানে নিজেদের উদ্যোগে নিরাপদ হেফাজতে জড়ো হয়েছে। আরো অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তালিকায় ‘শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী’ হিসেবে চিহ্নিত ৭৩ জনের ১ থেকে ২০ নম্বরের অধিকাংশই নিরাপদ হেফাজতে এসেছে।
এসপি মাসুদ বলেন, গত বছর ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মহেশখালীতে ৪৩ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। এটি সম্ভব হয়েছিল বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল-২৪’ এর সাংবাদিক আকরাম হোসাইনের সঙ্গে তাদের ( জলদস্যুদের ) যোগাযোগ হওয়ার পর।
ওই জলদস্যুরা এখন কক্সবাজার কারাগারে বন্দি আছেন। গত প্রায় ২ মাস আগে আকরাম তাদের খোঁজ খবর নিতে কক্সবাজার কারাগারে গিয়েছিলেন। তখন মাদক মামলার কয়েকজন আসামির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। সে ওই মাদক মামলার আসামিদের কাছেই খবর পান, ইয়াবা পাচারকারীদের একটা অংশ মহেশখালীর জলদস্যুদের মত আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান।
মাসুদ বলেন, বিষয়টি আকরাম হোসাইন পুলিশসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট মহলে জানান। এরপর পুলিশের মধ্যেও এ নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়।
এরই মধ্যে ইয়াবা চোরাকারবারিদের কাছে প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলে লিখিতভাবে অবহিত করি। এটি উর্ধ্বতনের কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে যাচ্ছে।
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আত্মসমর্পণের আগের দিন ( ১৫ ফেব্রুয়ারি ) পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ও চিহ্নিত যে কোন ইয়াবা চোরাকারবারির স্বেচ্ছায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাবেন।
তবে কতজন আত্মসমর্পণের জন্য নিরাপদ হেফাজতে এসেছে এবং কি ধরনের শর্তে এসব ইয়াবা চোরাকারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দেয়া হবে তা কৌশলগত কারণে প্রকাশ করতে রাজী হননি এসপি।
তবে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টরাসহ চ্যানেল-২৪ এর সাংবাদিক আকরাম হোসাইনের সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এখন পর্যন্ত অন্তত দেড় শতাধিক তালিকাভুক্ত ও চিহ্নিত ইয়াবা চোরাকারবারি আত্মসমর্পণের জন্য নিজেদের উদ্যোগে নিরাপদ হেফাজতে জড়ো হয়েছেন। আরো অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে যোগাযোগ করছেন।
গতবছরের শেষদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা সর্বশেষ তালিকায় ইয়াবা পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত ১ হাজার ১৫১ জন কক্সবাজারের। তাদের মধ্যে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৭৩ জনকে।
‘শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ’ তালিকায় থাকা কক্সবাজারের ১ হাজার ১৫১ জনের মধ্যে বড় একটা অংশেরই বসবাস সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলায়। তাদের সবাই কম বেশী প্রভাবশালী, কেউ কেউ আবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও।
সরকারি সর্বশেষ হালনাগাদ করা প্রতিবেদনের তালিকায় ‘শীর্ষ ইয়াবা চোরাকারবারি’ হিসেবে চিহ্নিত ৭৩ জনের মধ্যে ১ নম্বরে নাম রয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ (কক্সবাজার-০৪) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এ নেতা বদির পাঁচ ভাই আব্দুর শুক্কুর, আব্দুল আমিন, মুজিবুর রহমান, মোহাম্মদ সফিক ও মোহাম্মদ ফয়সাল এবং ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু, বেয়াই শাহেদ কামাল ও ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেলের নামও ওই তালিকায় ছিল বলে গণমাধ্যমে সেইসময় খবর বেরিয়েছিল।
‘চলো যায় যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ শ্লোগানে গতবছর ৪ মে থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানে। এতে কক্সবাজারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্ধের জেরে নিহত হয় ৫৪ জন মাদক ব্যবসায়ী। এদের বেশীর ভাগই টেকনাফের বাসিন্দা। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল সংখ্যক ইয়াবা ও অস্ত্র।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের উপস্থিতিতে ইয়াবা চোরাকারবারিরা আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানাব এসপি মাসুদ হোসেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রী ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিমান যোগে কক্সবাজার পৌঁছবেন। এরপর ওইদিন বিকাল ৪ টা হোটেল সায়মান রিসোর্টে জেলার উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করবেন। পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিতব্য আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। ওইদিন দুপুরের পর কক্সবাজার ফিরে হোটেলে রাত্রিযাপন করবেন।
পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি বিমান যোগে কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফিরবেন বলে জানান এসপি।
মাসুদ জানান, ইয়াবা চোরাকারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে জেলা পুলিশ সার্বিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে অনুষ্ঠানস্থল নির্ধারণসহ প্রশাসনিক সার্বিক প্রস্তুতির কাজও অনেকদূর এগিয়েছে।
এ নিয়ে সার্বিক প্রস্তুতির আগাম খোঁজ খবর নিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সফরে আসছেন বলেও জানান এসপি।
সূত্র: বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যেম।

