বদরুল আমীনঃ সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে প্রচলিত ধরণ বদল করে নানা কৌশলে ময়মনসিংহে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক। এর জন্য প্রশাসনের গাফিলতিকে দায়ি করছেন বিশিষ্টজনেরা। প্রশাসন বলছে কোচিং ব্যবসায় জড়িত সরকারি-বেসকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তালিকা করা হচ্ছে। কোচিং বানিজ্যে শহরের তিনটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েকজন শিক্ষক ছাড়াও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু শিক্ষক রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নগরীর কোচিং পাড়া হিসেবে পরিচতি পাওয়া বাউন্ডারী রোড, নাহা রোড, নতুন বাজার, কালি বাড়ি, নতুন বাজার কানাডা স্কয়ার মার্কেটের পিছনে, গোলকি বাড়ি এবং জিলা স্কুল রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বহু কোচিং সেন্টার। এসবের অধিকাংশ কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত রয়েছেন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক। এদের মধ্যে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মুঞ্জু স্যারের নাম উল্লেখযোগ্য।
এর মধ্যে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক আনোয়ার কাদের, জিলা স্কুলের ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষক আশরাফুল হক ভূইয়া ও মোহাম্মদ মকবুল হোসেন, কাশিগঞ্জ কলেজের ইংরেজী বিভাগের প্রভাষক তোফায়েল আহমেদ সবুজ, আফরোজ খান মডেল স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক মাহবুব হোসেন, মুসলিম গার্লস স্কুলের গণিতের শিক্ষক বাবুল হোসেন ও জালাল উদ্দিন, প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাই স্কুলের গণিতের শিক্ষক রিপন কুমার দাস এবং আশরাফুজ্জামান, ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের বিজ্ঞানের প্রভাষক সুব্রতসহ ৫০-৬০ জন কোচিং বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে, জিলা স্কুল রোডে দরজা বন্ধ করে ক্লাশ নিতে দেখা যায় বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক আনোয়ার কাদের রতনকে। তবে কোচিং বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি সরকারের নিয়ম মেনেই বাসায় প্রাইভেট পড়াচ্ছি, কোন কোচিং নয়।
কোচিং করতে আসা যুবরাজ হোসাইন নামে দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী বলেন, আনোয়ার কাদের স্যার বিজ্ঞান ভালো পড়ান, তিনি একজন ভালো শিক্ষক। স্যার প্রতিদিন ৮-১০টি ব্যাচ পড়ান। প্রতিটি ব্যাচে ২৫-৩০জন শিক্ষার্থী পড়ে।
নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রিয়াজ হাসান বলেন, শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে সরকারি নির্দেশনার আগে আনোয়ার কাদের স্যার বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং করাতেন। এখন নিজের বাসায় কোচিং করান। সকাল-বিকাল বিদ্যাময়ী এবং জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকটি ব্যাচ পড়ান। আগে স্যার প্রতিমাসে ১৫শ’ টাকা করে কোচিং ফি নিতেন। এখন দিতে হয় ৩হাজার টাকা।
জিলা স্কুলের বিপরীতে রতন’স ক্রিয়েটিভ সায়েন্স কোচিং সেন্টারের পরিচালক ও ফুলবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের জীববিজ্ঞানের প্রভাষক হাসান মতিউর রহমান রতনের জমজমাট কোচিং চলছে। জিলা স্কুলের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে সেখানে ক্লাশ করাতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগেই দুই মাসের টাকা অগ্রিম নেয়া হয়েছে। তাই দুই মাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোচিং বন্ধ করা যাবেনা।
জিলা স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক আশরাফুল হক ভূইয়া বলেন, শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকের চাপে ৮-১০জন করে প্রাইভেট পড়াচ্ছি। সামান্য বেতনে জীবন চলে না। সরকার চাইলে তাও বন্ধ করে দেবে।
প্রিমিয়ার আইডিলায় স্কুলের গণিতের শিক্ষক এনামউল্লাহ দৈনিক ৮-১০ ব্যাচ পড়াচ্ছেন। প্রতিটি ব্যাচে ২৫-৩০ জন করে শিক্ষার্থী রয়েছেন। তিনি বলেন, স্কুল থেকে যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে কোচিং চালু রেখেছি। প্রয়োজনে চাকুরী ছেড়ে দেব। কোচিং ছাড়তে পারবনা।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক রাজিয়া সুলতানা, সোহেল হায়দার এবং নজরুল ইসলাম বলেন, সন্তানদের পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে আমারা তাদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে আসতে বাধ্য হয়েছি। তবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যদি কোচিং না করায় তাহলে আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হবে না। আর কেউ পড়াবে কেউ পড়াবে না তাহলে সমস্যা থেকেই যাবে।
ফ্রী ল্যান্সার নাঈম হোসেন এবং আবু সাঈদ জানান, আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। আশা করছি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তাদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ রাখবে। অন্যথায় প্রশাসনকে দাবি জানাবো তারা যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। শিক্ষায় বৈষম্য দূর করা এবং মানসম্মত শিক্ষায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা জরুরী হয়ে পড়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
ময়মনসিংহ জেলা জনউদ্যোগের আহবায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা প্রত্যেক শিক্ষকের দায়িত্ব। তার ব্যতিক্রম কিছু শিক্ষকের কাছ থেকে আশা করা কাম্য নয়! সে ক্ষেত্রে আইননের প্রয়োগ অত্যাশ্যক উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষকরা নির্দেশনা অমান্য করলে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ময়মনসিংহ মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম সরোওয়ার, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহসিনা খাতুন ও বিদ্যাময়ী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক দিল খুরশীদ জামান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক আগে কোচিং করাতো। কোচিং বন্ধে সরকারের নির্দেশনার পর থেকে জানা মতে কোন শিক্ষক কোচিং করান না। তবে কেউ যদি কোচিং করান তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু শিক্ষক কোচিং এবং প্রাইভেট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে শুনেছি। আমরা তাদের তালিকা তৈরি করছি। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা উপ-পরিচালক আবুনুর মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিয়ম বর্হিভূত ভাবে ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী পড়ালে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে বলেও তিনি জানান।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে কোচিং বাণিজ্যকারীদের কোন ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ালে তার দায়-দায়িত্ব তাদেরকেই বহন করতে হবে। আমরা কাউকেই ছাড় দেব না। শীঘ্রই তাদের সনাক্তে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

