আবদুল লতিফ লায়নঃ দিন যত যাচ্ছে ততই সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা বেড়েই চলেছে। একটু চোখ-কান সজাগ রাখলেই বুঝতে পারবেন সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা কি? মফস্বলে এখন সাংবাদিকদের নানা নামে ডাকা হয়। কেউ ডাকেন সামবাদিক সাহেব, কেউ বা হলুদ আবার কেউ ডাকে ভূয়া অথবা সাংঘাতিক বলে। সাংবাদিকের মতো এতো পবিত্রতম একটি শব্দ ও পেশাকে কেন সামবাদিক, হলুদ বা ভূয়া সামবাদিক বলে ডাকা হয় তা কি কখনো গণমাধ্যম বিশিষ্টজনরা ভেবে দেখেছেন? সাংবাদিক শব্দটা যাদের জন্য “সামবাদিক” হয়েছে তাদের লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। সাংবাদিকতার মতো পবিত্রতম পেশাটাকে এরা কলংকিত করে রীতিমতো উলঙ্গ করে ফেলছে। ফেসবুকে পোস্ট করেই এরা বলে টিভি নিউজ। সারা জীবন দেখে আসলাম আগামি কালের পত্রিকা ছাপা হয় রাত ১২ টার পরে। অথচ এখন দেখি যখনকার ঘটনা তার কিছুক্ষণ পরই পত্রিকাতে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। এ আবার কি ধরণের সামবাদিকতা ! পরের দিনের সংবাদ আগের দিনেই প্রকাশ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়-ওটা পত্রিকা না। পত্রিকার মতো পোস্টার করে ওরা। তারপর ছেড়ে দেয় ফেসবুকে। আর যাদের নিউজ থাকে তাদের ট্যাগ করে দেওয়া হয়। এতে নাকি ঐ সাংবাদিকের গুরুত্ব বাড়ে। যত তাড়াতাড়ি নিউজ এনে দিতে পারবে তত বড় সামবাদিক হতে পারবে তারা। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে এরা দিনের পর দিন এভাবেই সেবামূলক মহান পেশাটাকে উলঙ্গ করছে সব জায়াগাতে। ১/২ হাজার টাকা দিয়ে অনলাইন খুলেই সম্পাদক, স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র রিপোর্টার, জেলা প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছে। যোগ্যতার কথা নাই বা তুললাম। কোন রকম ফেসবুকে শেয়ার করার মতো যোগ্যতা থাকলেই হলো। প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা এখানে চতুর্থ বিষয়। যখন দেখি দেশের প্রথম সারির পত্রিকা তাদের জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত দেন শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে স্নাতক। তখন স্বপ্ন দেখি সাংবাদিকতার সুদিনের। কিন্তু যখন দেখি স্নাতক তো দূরের কথা কোনদিন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পা দেয়নি এমন লোককে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দেন তখন চরম হতাশায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়। যাদের আয়ের কোন উৎস নেই অথচ তারা দিব্যি বাড়িতে বিল্ডিং, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেলসহ দামি ব্রান্ডের মোবাইল ব্যবহার করছেন। কোথায় পাচ্ছে এগুলো? যখন দেখি দেশের প্রথম সারির মিডিয়ার সহকর্মীরা ঐ সকল ভূঁইফোড় অনলাইন, আন্ডারগ্রাউন্ডের পত্রিকা ও টিভির নামে ফেসবুকে দেওয়া সামবাদিকদের হাতে হাত ধরে কোন দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়ায় তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই মহান পেশার বন্ধুরা কি এতোটাই মানষিক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। এভাবে হাতে হাত ধরে দাবি আদায়ে রাস্তায় দাঁড়ালে সব সময়ই অধিকার আদায় হয় কিনা জানিনা। তবে হলফ করে এতটুকু বলতে পারি- আপনাদের সাথে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি তুলে ঐ সকল সামবাদিকরা লাভবান হয় সব জায়গায়। তারা ঐ ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে সবাইকে জানান দেয় তারা এখন অনেক মস্ত বড় সাংবাদিক হয়ে গিয়েছে। এ সকল সাংবাদিকদের মানবিক, জনদুর্ভোগ কিংবা উন্নয়নমূলক কোন প্রতিবেদন তৈরি করতে দেখা যায় না। কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা হত্যাকান্ড ঘটলে ঘটনাস্থলেও তাদের চোখে পড়েনা। কারণ এ সকল সংবাদ সংগ্রহে কোন অর্থ পাওয়া যায় না। বরং আরো নিজের পকেট থেকে যায়। এদের বেশি দেখা যায় সংবাদ সম্মেলনের স্থানে, গ্রামের আনাচে-কানাচে দিয়ে। গ্রামের সরল-সহজ মানুষগুলোকে রীতিমতো সাংবাদিকতার ভয় দেখিয়ে এরা হাতিয়ে নেয় টাকা। সংবাদ সম্মেলনের গিয়ে এদের জন্য ছবি তোলায় দায় হয়ে পড়ে মূলধারার সাংবাদিকদের। এখনো সময় আছে। যারা গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করছেন যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদেরকে এ সকল ভূয়া ও হলুদ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এদের লাগাম টেনে ধরার। এখনই সবার উচিত এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। গণমাধ্যমকে আরো অধিক স্বচ্ছতার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। আর এ কাজে সকল সহযোদ্ধাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হয়ত দেশের গণমাধ্যম পেশাদারিত্বের সফলতার জায়গায় পৌঁছে যাবে।

