(পর্ব-১)
সুমন ভৌমিকঃ ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দু’শতাধিক দলালের আনাগোনা। তাদের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় একশজন দালাল কাজ করে পাসপোর্ট অফিসে। ঘুষ ও দালাল ধরা ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া আর সোনার ডিম পাওয়া সমান কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সব দালালদের শক্তিশালী সেন্ডিকেট ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস দখলে রেখেছে। অফিস খরচের নামে দালালদের প্রতি পাসপোর্ট বাবদ দিতে হয় অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
শক্তিশালী এ দালাল চক্রকে সার্বিক সহযোগিতা করে উৎকোচ বানিজ্যের মদত দিচ্ছেন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত অফিস সহকারী শিপন ও বায়েজিদ এবং তাদের সহযোগিতা করছেন পাসপোর্ট অফিসের সুমন ও আনসার সদস্য আনিস। তারা প্রতি ফাইলে আগে ঘুষ নিতো ১৫০০ টাকা কিন্তু এখন ঘুষ নিচ্ছেন ১২০০ টাকা। ফলে দুর্নীতি’র মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক সালাহ উদ্দিন রহস্যজনক কারনে অফিসে কর্মরত ঘুষ দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
দালাল চক্র সিন্ডিকেটের সদস্যরা বেশ শক্তিশালী। তারা পাসপোর্ট অফিসের সামনে ঘর ভাড়া নিয়ে অফিস খুলে করছেন পাসপোর্টের কাজ। দালালরা পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের কাছ থেকে চাহিদা মতো নিচ্ছেন অতিরিক্ত টাকা। পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে কোন পত্রিকায় লিখলেই তারা কাউন্টার নিউজ অথবা পাসপোর্ট অফিসের পক্ষে প্রতিবাদ ছাপায়।
স্থানীয় এক নেতা প্রতিবেদনকে জানান, ঘুষ ও দালাল ধরা ছাড়া পাসপোর্ট দ্রুত মিলবে না এবং কখনো দেখা যায় পাসপোর্ট পাওয়াও যায় না। দালালকে চাহিদা মত টাকা দিলেই আবেদনকারী পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু পাসপোর্ট অফিস দালালদের মাধ্যমে তাদেরকেও ম্যানেজ করেছে। পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বানিজ্য নতুন কোন ঘটনা নয়।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় প্রশাসন পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বানিজ্যের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় না। বেশ কয়েক বছর আগে র্যাব ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়েছিল। ১০/১২ জন পাসপোর্ট দালালকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছিল। এতে ঘুষ বানিজ্য কিছুদিন বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন কোন অভিযান না হওয়ায় দালাল ও পাসপোর্ট অফিসের কর্মরত কিছু কর্মচারী আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, র্যাব ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ঘুষ বানিজ্য বন্ধে আবারও যেন অভিযান চালায়।
একজন ভুক্তভোগী জানান, অনলাইনে আবেদন করার পর আবেদন পত্রটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে গেলে অফিসের জমাগ্রহণকারী বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে জমা নেয় না। পরে বাধ্য হয়ে দালাল ধরে ৩ হাজার টাকা বেশি দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে আবেদন পত্রটি জমা দেওয়া হয়।
বিভিন্ন অজুহাত বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী জানান, আপনি দালাল না ধরে অনলাইনে আবেদনের পর আবেদন পত্রটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে গেলে তারা বলবে এ বানান ভুল হয়েছে, ওই বানান ভুল হয়েছে। কিন্তু দালাল ধরে কাজটি করলে যত ভুলই হোক সব ঠিক আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দালাল জানায়, তাদের ফাইলে আলাদা করে সংকেত দেওয়া থাকে। দিন শেষে ফাইল হিসাব করে প্রতি ফাইলে ১২০০ টাকা দিতে হয় পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের। পাসপোর্ট অফিস টাকা খায়। তাই দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করলে কোন ঝামেলা পোহাতে হবে না।
সরজমিন দেখা যায়, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালাল না ধরে সেবা পাওয়া খুবই কঠিন। আবেদনকারীর আবেদন পূরণ করা থেকে জমা দেয়া এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে পাসপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত সব কাজই করেন দালালরা। দালালদের চাহিদা মতো টাকা দিলে সময় মতো মিলছে পাসপোর্ট। এর ফলে পাসপোর্ট আবেদনকারীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পাসপোর্ট আবেদনকারী ও সচেতন মহল দাবি জানান, র্যাব-পুলিশ ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে যেন ঘুষ বানিজ্যের দুর্নীতি বন্ধ করে।
জানা যায়, ২০১৯ সালে ময়মনসিংহ দুদক টিম পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করে এবং র্যাব-১৪ অভিযান চালিয়ে ৩ মানবপাচারকারীকে গ্রেফতারসহ ৬ নারীকে উদ্ধার করেছে।
এই অভিযান ছাড়া প্রায় গত দুই বছরে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে স্থানীয় প্রশাসনসহ কেউ ঘুষ বানিজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেননি। স্থানীয় এলাকাবাসী দাবি জানিয়ে বলেন, পুলিশ প্রশাসন ও র্যাব-১৪ পাসপোর্ট অফিসের ঘুষ বানিজ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুততর ব্যবস্থা নেয়।

