ময়মনসিংহের ইতিকথা

Date:

একে এম ফখরুল আলম বাপ্পী চৌধুরী ॥

২৩৪ বছর পূর্বে  ১ লা মে ১৭৮৭ খ্রি: এই দিনে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাহলে  “১ লা মে ময়মনসিংহ জেলার জন্মদিন”

ময়মনসিংহ জেলার নাম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত আছে।

মোঘল আমলে মোমেনশাহ নামে একজন সাধক ছিলেন, তাঁর নামেই মধ্যযুগে অঞ্চলটির নাম হয় মোমেনশাহী। ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার স্বাধীন সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাঁর পুত্র সৈয়দ নাসির উদ্দিন নসরত শাহ’র জন্য এ অঞ্চলে একটি নতুন রাজ্য গঠন করেছিলেন, সেই থেকেই নসরতশাহী বা নাসিরাবাদ নামে সৃষ্টি।

নাসিরাবাদ নাম পরিবর্তন হয়ে ময়মনসিংহ হয় একটি ভুলের কারণে।

বিশ টিন কেরোসিন বুক করা হয়েছিল বর্জনলাল এন্ড কোম্পানীর পক্ষ থেকে নাসিরাবাদ রেল স্টেশনে।

এই মাল চলে যায় রাজপুতনার নাসিরাবাদ রেল স্টেশনে।

এ নিয়ে অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হয়। পরবর্তীতে আরো কিছু বিভ্রান্তি ঘটায় রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ময়মনসিংহ রাখা হয়।

সেই থেকে নাসিরাবাদের পরিবর্তে ময়মনসিংহ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কিছু কিছু ইতিহাসবিদগণ তাদের লেখনিতে এভাবে উল্লেখ্য করেন। ১৭৭৯ তে প্রকাশিত রেনেল এর ম্যাপে মোমেসিং নামটি বর্তমান ‘ময়মনসিংহ’ অঞ্চলকেই নির্দেশ করে, তার আগে আইন-ই-আকবরীতে

মিহশানশাহী’ এবং ‘মনমনিসিংহ’ সরকার বাজুহার পরগনা হিসাবে লিখিত আছে; যা বর্তমান ময়মনসিংহকেই ধরা যায়।

এসব বিবেচনায় বলা যায় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের পূর্বে থেকেই ময়মনসিংহ নামটি প্রচরিত ছিলো। জেলা পত্তন কালে ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমৃদ্ধ জমিদারগন সরকারের কাছে জেলা নাম ময়মনসিংহ রাখার আবেদন করলে সরকার তা গ্রহণ করে নেন।

ময়মনসিংহ এক সময় ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ জেলা ছিল ।ভারতবর্ষের সেই বৃহত্তম জেলা সময়ের বিবর্তনের ছয় জেলায় রূপান্তরিত হলেও জেলা সদরের গুরুত্ব তুলনামূলক বিচারে কমে যায়নি। ব্রহ্মপুত্র বিধৌত বাংলাদেশের এই উর্বর ভূমি শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য ও লোক-সংস্কৃতির এক বিপুল আধার।

ময়মনসিংহ ইতিহাস অতিশয় সমৃদ্ধ। উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণে ভাওয়াল মধুপুরের বনাঞ্চল, পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎসারিত মেঘনার জল বেষ্টনী এবং পূর্বে সোমেশ্বরী, তিতাস, সুরমা ও মেঘনা নদীর অববাহিকা অঞ্চল, প্রাকৃতিক প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলকে বরাবরই একটি দুর্জেয় অঞ্চল হিসেবে দেখতে পাওয়া যেত। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ একমত পোষণ করেন যে, বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন বংগরাজ্য। গোড়ার দিকে ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর গড়সহ লালমাটির অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন বংগরাজ্য। হিন্দু রাজাগণের মৌর্য শাসন এর প্রতিষ্টা ও পরবর্তী সময় গুপ্ত ও পার শাসকদের ইতহাস ময়মনসিংহকে ঘিরে রেখেছে। শেষের দিকে সেন বংশীয় রাজাদের প্রশাসনিক দৌর্বল্যে  মুসরমান বাদশাহগন বাংলায় রাজত্ব কায়েমের প্রভাব ময়মনসিংহেও পড়ে। সিকান্দর শাহ এর আমল থেকে মোঘর সাম্রাজ্য পেরিয়ে নবাবী আমল, কোম্পানী আমল এবং শেষে পাকিস্তানি শাসন-শোষণে ময়মনসিংহ ও প্রভাবান্বিত হয়। বিভিন্ন সূত্রে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩৯টি পরগনার নাম পাওয়া যায়- ময়মনসিংহ, আলাপসিংহ, জাফরশাহী, বনভাওয়াল, পুথুরিয়া, কাগমারী, আন্টীয়া, বড় বাজু, সেরপুর, হাজবাদি, খালিয়াজুরী, জয়নশাহী, কুড়ি খাই, নছরৎশাহী, লতিফুর, মকিমাবাদ, আটগাও, বলরামপুর, বরিকান্দি, বাউ খন্দ, চন্দ্রপ্রতাপ, ঈদগা, ইছকাবাদ, বায দোম, সিংধা দরজিবাজ, কাসেমপুর, নিক্লী, সাসরদি, হাউলী, জকুজিয়াল, ইছাপুর, বরদাখতি, পাতিলা দহ, তুলন্দর, ইছপসাহী, হোসেনশাহী, হোসেনপুর, সুসঙ্গ ও নাসিরুর্জিয়াল।

৭১ এ ময়মনসিংহের ভূমিকাঃ

১৯৭১-এর ২৫ মার্চে ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরুর অব্যবহিত পরে ময়মনসিংহের সংগ্রামী জনতা খাগডহর তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প ঘেরাও করে এবং বাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এ যুদ্ধে ইপিআর সদস্য দেলোয়ার হোসেন ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের ড্রাইভার পুত্র আবু তাহের মুকুল শাহাদাৎ বরণ করেন। মূলতঃ এই যুদ্ধের পর পরই ময়মনসিংহের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত সীমান্ত ফাঁড়িগুলি বাঙ্গালী বিডিআর-দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নিহত পাক সেনাদের লাশ নিয়ে ময়মনসিংহবাসী বিজয় মিছিল করতে থাকে ও ধৃত অন্যান্য পাকসেনাদের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ময়মনসিংহ জেলখানায় প্রেরণ করা হয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময় এক সকালে পুরাতন বিডিআর ভবনের ৩য় তলার শীর্ষে হাজার হাজার লোকের জয় বাংলা ধ্বনির মধ্যে বাংলাদেশের নকশা খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়।

ময়মনসিংহ জেলা অবস্থান ও  আয়তনগত বিবরণঃ

২৪০০২’৩১’’ থেকে ২৫০২৫’৫৬’’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯০৩৯’০০’’ থেকে ৯১০১৫’৩৫’’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ-এ। উত্তরে গারোপাহাড় ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে গাজীপুর জেলা, পূর্বে নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। আয়তন ৪৩৬৩.৪৮ বর্গ কিলোমিটার। এটি ১৩টি উপজেলা, ১৪টি থানা।

“সর্বোপরি, হাওর বাওর মইষের সিং, এই তিনে ময়মনসিং”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান