একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের পেশী-শক্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে অভ্যন্তরীন কোন্দলের জেরে গত ২৫ শে ফেব্রুয়ারী/২০১৮ মৃত্যঞ্জয় স্কুল রোডে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আশফাক আল রাফী শাওনকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পরে গত ১৪ মে একই এলাকার ডিফেন্সপার্টি কার্যালয়ের ভিতরে আনুমানিক রাত ২টায় ময়মনসিংহ জেলা যুবলীগ নেতা ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি রেজাউল করিম রাসেল (৩৫) কে এ্যালোপাথারী ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুবৃত্তরা। তার পিঠে, গালে ও কপালে একাধিক স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহৃ পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিহত রাসেলের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন লিমন ও বড় বোন জেসমিন আক্তার হোসেন জানান, গত এক বছর ধরে বিভিন্ন সময় শহর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ্ আল মামুন আরিফের সন্ত্রাসী বাহিনী রাসেলের উপর হামলা করে আহত করেছে। রাসেলের বাড়ি-ঘর ভাংচুর করেছে। গত রোজার মাসে আরিফের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তার উপর হামলা করে একটি আঙ্গুল কেটে নিয়ে যায়। তখন থেকে তাকে হত্যার হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে আরিফ। এরপর বিষয়টি সমাধানের জন্য একাধিকবার আরিফের সাথে বসার আহবান জানিয়েও কোন প্রকার সমঝোতা হয়নি। কান্না জড়িত কন্ঠে তার বড় বোন নিশ্চিত করে বলেন, আরিফের নেতৃত্বেই আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আরিফের নির্দেশ ও সহযোগিতা ছাড়া আমার ভাইকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আরিফ ছাড়া আমার ভাইয়ের আর কোন শত্রু নেই । স্বজন ও এলাকাবাসী এ হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসী দাবী করেন।এ ব্যাপারে রাসেলের চাচা সিদ্দিকুর রহমান মাস্টার বলেন, রাসেল রাজনীতি করতো। রাজনীতির প্রতিহিংসার জেরেই তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে জড়িত খুনীদের তিনি ফাঁসী দাবী করেন।
একাধিক বার র্যাব ও পুলিশকে এসোল্টকারী, বহু সন্ত্রাসী ঘটনার নায়ক, ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রক, বালু মহল দখল, বহু মামলার আসামী আরিফের নেতৃত্বে গত ১৪ মে রাতে যুবলীগ নেতা রাসেল হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪ জনকে আটক করেছে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এলাকাবাসী জানান, হত্যার পূর্বে তার বন্ধুরা রাসেলকে নিয়ে ঘটনা স্থলে আড্ডা দিচ্ছিলো। গভীর রাতে ওই ডিফেন্স পার্টি অফিসে চিৎকারের শব্দ শুনেন তারা। এই আস্তানাটি ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রনকারী চক্রের।
জনশ্রুতি রয়েছে, এখানে আওয়ামী লীগের চলমান গ্রুপিং এর এক পক্ষের সমর্থিত সন্ত্রাসীরা খুনের জায়গাটি নিজেদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতো। যারা আড্ডাদিত তারা সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও আরিফ বাহিনী হিসেবে পরিচিত। তাদের সমর্থিত নিহত রাসেল জেলা যুবলীগের সদস্য ছিলেন। নিহত রাসেল শহরতলীর শম্ভুগঞ্জ হরিপুর এলাকার জালাল উদ্দিন ওরফে জালাল ডিলারের ছেলে।
এ ব্যাপারে নিহতের পিতা বাদী হয়ে কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলা নং ৫১(৫)২০১৯। ধারা ১৪৩/৩০২/১১৪ ও ৩৪ দঃ বিধি। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৪ জন ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে জবান বন্দি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন স্বাক্ষী রয়েছেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের চৌকস অফিসার এস আই আকরাম হোসেন মামলার রহস্য উদঘাটনে সমর্থ হন। তবে মূল খুনিদের কেউ এখনো গ্রেফতার হয়নি। ঘটনা খতিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে, সমিতির নামে আরিফ ও তার ভাই তারেকের লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজীতে যুবলীগ নেতা রাসেল ভাগ বসাতে চেয়েছিল। এটাই কাল হয়ে দাড়িয়েছে রাসেলের। সুত্র জানায়, আরিফ ও তার ভাই তারেকের নেতৃত্বে তাকে সরিয়ে দেয়ার চিন্তা করা হয়। পরেই খুন হয় রাসেল।
যুবলীগ নেতা রাসেল হত্যার মূল আসামী সাবেক শহর ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুল্লাহ্ আল মামুন আরিফ। আরিফের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগ এর প্রতিবাদসহ বহুবার হাজার হাজার জনতা মানব-বন্ধন করে বিচার দাবী করে জেলা প্রশাসনের কাছে স্বারকলিপি দিয়েছে। প্রায় অর্ধশত জিডিসহ একাধিক মামলাও রয়েছে। শিল্প ও বানিজ্য মেলায় লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজীর অভিযোগ রয়েছে। এরশাদ সিকদারের মত হিন্দু ব্যক্তির জমি দখল, ঘাট দখল, সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রন, বালু মহল দখল ও সন্ত্রাসী চাঁদাবাজীতে তার নামডাক রয়েছে। এছাড়াও একাধিকবার তিনি পুলিশ ও র্যাবের সাথে অসাদাচারন করেছেন। অদৃশ্য গডফাদারের আর্শিবাদ পুষ্ট হওয়ায় এ পর্যন্ত তার গায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থ্যার আচঁরও লাগেনি!
রাসেল হত্যার ঘটনায় তার রাজনৈতিক সহকর্মিরা এখনো কানমুখ নারছেনা। আজাদ হত্যার ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগ চাঙ্গা হয়েছিল। ছাত্রলীগ নেতা শাওন হত্যায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানব-বন্ধন হয়েছিল কিন্তু রাসেল হত্যায়? আক্ষেপ নিহত রাসেলের পরিবারের, কিসের রাজনীতি? কোথায় আজ রাজনীতির সহকর্মিরা?
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নব-নির্বাচিত মেয়র ইকরামুল হক টিটু তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, জেলা যুবলীগের সদস্য রেজাউল করিম রাসেল হত্যার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।
ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহিত উর রহমান শান্ত বলেন, জেলা যুবলীগ সদস্য রেজাউল করিম রাসেল খুব ভালো মনের মানুষ ছিলো। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের খুনের রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিৎ। তিনি এই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানান। হত্যাকারী যেই হোক না কেন জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান।
উল্লেখ্য ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের পেশী-শক্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে আভ্যন্তরীন কোন্দলের জেরে গত বছরের ২৫ শে ফেব্রুয়ারী একই এলাকায় গুলিতে নিহত হয় জেলা ছাত্রলীগের আর এক সহ-সভাপতি আশফাক আল রাফী শাওন। অথচ খুনে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র আজও উদ্ধার হয়নি? এবার আর এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাসেল খুন হলো। রাসেল খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার হয়নি। তাহলে কি মূল খুনি এখনো গ্রেফতার হয়নি?

