ময়মনসিংহ নগরের সমাজসেবা কার্যালয় খোঁজ-খবর রাখছেন কি? (পর্ব-১)
সুমন ভৌমিকঃ ময়মনসিংহ ১নং রমেশ সেন রোডস্থ শুকতারা কল্যাণ সংস্থা। সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে লাইসেন্স প্রাপ্ত সংগঠন এটি। লাইসেন্স নং-ম-০১৪৩১। ২০০১ সালে স্থাপিত এই সংস্থাটি নিবন্ধিত হয় ২ জুন ২০০৪ সালে। সামাজিক উন্নয়ন, অবহেলিত নারী-শিশুদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ময়মনসিংহবাসী শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে অবহেলিত মানুষদের সাহায্য করণ সহ প্রায় ২০টি উন্নয়ন কাজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই সংস্থাটি নিবন্ধিত হয়েছিল। তবে দূভার্গ্যরে বিষয় শুকতারা কল্যাণ সংস্থা আজ পর্যন্ত তাদের গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত কোন একটি কাজও করেনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কাদের স্বার্থে এই শুকতারা কল্যাণ সংস্থা?
বাস্তবে এই সংস্থাটি কী ভূমিকা পালন করছে, এটি শুনলে আঁতকে উঠবে নিবন্ধন প্রদানকারী সংস্থাও। ময়মনসিংহ নগরে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লাইসেন্স গ্রহণ করে শুকতারা কল্যাণ সংস্থাটির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভানেত্রী নিরীহ মেয়েদের পতিতা বানানোর কাজে দালালি করে বেড়াচ্ছে। পুলিশের সাথে অবৈধ লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হয় এই সংস্থার মেয়াদোত্তীর্ণ সভানেত্রী। যার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই।
বর্তমান লোক দেখানো ভাবে এই সংস্থাটি কাজ করছে ময়মনসিংহ গাঙ্গিনারপাড়স্থ রমেশ সেন রোড পতিতাপল্লীর প্রায় ৩৫০ জন পতিতার স্বার্থ রক্ষার জন্য। যদিওবা তার পাশবিক নির্যাতনে আগেই প্রায় ১৫০ জন পতিতা অন্যত্র চলে গেছে। প্রায় ৩৫০ জন পতিতাদের একটু ভাগ্যোন্নয়ন হতো তাহলেও এই সংস্থার তিল পরিমাণ সাফল্য চোখে আসতো। কিন্তু এই সংস্থাটি বর্তমানে প্রায় ৩৫০ জন পতিতার রক্ত চোষে বেড়াচ্ছে। শুধুমাত্র সাধারণ পতিতাদের কাছ থেকে ছল-চাতুরী, ভয়-ভীতি দেখিয়ে কীভাবে অর্থ আদায় করা সম্ভব এটিই একমাত্র লক্ষ্য শুকতারা কল্যাণ সংস্থার মেয়াদোত্তীর্ণ সভানেত্রীর। পতিতাপল্লীর কোন কিশোরী মেয়ে আসার পর পুলিশের সাথে দেন-দরবারে উপস্থিত হয় সংস্থার কথিত মেয়াদোত্তীর্ণ সভানেত্রীকে এবং প্রথম তাকে দেখাতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও নিরীহ পতিতার মধ্যকার মধ্যস্থতা (দালালি) করে হাতিয়ে নেয় লাক্ষাধিক টাকা সভানেত্রী। এছাড়াও অশিক্ষিত পতিতাদের পুলিশী ভয়ভীতি দেখিয়ে কিছুদিন পর পর শুকতারা কল্যাণ সংস্থার কথিত সভানেত্রীর কর্তৃক অর্থ আদায় (যাকে সম্মানি বলে) করার বহু অভিযোগ রয়েছে।
শুকতারা কল্যাণ সংস্থার সংবিধান অনুযায়ী এ সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদে সদস্য সংখ্যা থাকবে ১১ জন। কিন্তু এই ১১ জনের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক সহ অনেকেই অন্যত্র চলে গেছে। শূণ্য পদ নিয়েই সাইনবোর্ড নামে সর্বস্ব চলছে সংস্থাটি। মাঠ পর্যায়ে সংগঠনের সভানেত্রীর নাম শুনা গেলেও-পাগলা ঘোড়ার মতো অর্থের নেশায় ছুটছে।
শুকতারা কল্যাণ সংস্থার সংবিধানের ৬ ধারা অনুযায়ী ৩ প্রকারের সদস্য থাকবে। ১) সাধারণ সদস্য, ২) আজীবন সদস্য, ৩) দাতা সদস্য। ধারা ৭ এ উল্লেখ রয়েছে, ১৮ বৎসরের অধিক যেকোন পুরুষ বা নারী এককালীন ১০০ টাকা বিনিময়ে আবেদন ফরম সংগ্রহ করে সংস্থার সাধারণ সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং সংস্থার স্বার্থে নির্বাহী পরিষদের সভার অনুমোদন লাভ করিলে সদস্য পদ লাভ করবে। প্রত্যেকে (সদস্যকে) মাসিক ২০ টাকা চাঁদা দিতে হইবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভানেত্রীর একক নিদের্শে শুধুমাত্র পতিতা ছাড়া কেউ এ সংস্থার সদস্য হওয়ার আবেদনপত্র ক্রয় করতে পারবেন না বলে বিশ্বস্থ সূত্র জানায়।
সংস্থার প্রত্যেক সাধারণ সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক ২০ টাকা চাঁদা উত্তোলন করা হলেও সংস্থার আয়-ব্যয় বিবরনীতে কোন সামঞ্জস্য নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, সংস্থাটি ২০১৪ সালের পরবর্তী সময় থেকে জাতীয় দিবসগুলোতে কোনপ্রকার অনুষ্ঠান কিংবা একাত্মতা ঘোষণা করে না। যা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় অবমাননা। প্রতিটি নিবন্ধনকৃত সংস্থাই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
সূত্র থেকে জানা যায়-প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা (এনজিও) রমেশ সেন রোডস্থ যৌনপল্লীর পতিতাদের প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা,স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিভিন্ন সক্রামক রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, জীবনযাত্রার মানকে আরো উন্নত করনের লক্ষ্যে কর্মশালা পরিচালনা করার জন্য শুকতারা কল্যাণ সংস্থার দ¦ারস্থ হলেও তারা কখনও আগ্রহ দেখায়নি। একটি সূত্র জানায়, বেশ কয়েকবার কয়েকটি বেসরকারী সংস্থা (এনজিও) থেকে নিয়মিত অনুদান পায় শুকতারা কল্যাণ সংস্থা। কিন্তু এই অনুদান কোন ক্ষেত্রে ব্যয় করা হচ্ছে তার কোন হিসাব নেই।
অবাক হওয়ার বিষয়, সংস্থার অধিকাংশ সাধারণ সদস্যরাই অশিক্ষিত। সংস্থার সভানেত্রীর কোন কাজে ওদের স্বাক্ষর বা টিপসহির প্রয়োজন হলে বিভিন্ন টালবাহানায় তা হাসিল করা হয়। শুকতারা কল্যাণ সংস্থার গঠনতন্ত্রে দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনের উল্লেখ থাকলেও গত ৬ বছর প্রায় ৯ মাস যাবৎ এ সংস্থার কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বিগত ৩০-০৮-২০১৪ইং তারিখে সর্বশেষ দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শুকতারা কল্যাণ সংস্থার গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে কোন ব্যক্তি একই পদে শুধুমাত্র ২ বার নির্বাচিত হতে পারবেন। কিন্ত লাভলী রাণী সরকার পরপর ৩ বার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছে ২০১৪ সাল পযর্ন্ত। যদিও সভানেত্রী লাভলী রাণী সরকার প্রচার চালিয়ে বলে, শুকতারা কল্যাণ সংস্থা এখন দ্বি-বার্ষিক নয়, ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। করোনাকালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো কিন্তু ছল-চাতুরীর মাধ্যমে কোন প্রকার প্রার্থী না দেখিয়ে পূর্বের কমিটির দ্বারাই সংস্থাটি চলছে। কিন্তু কীভাবে একই পদে লাভলী সরকার ৪ বার ও রুমানা আক্তার রুমা ৩ বার বহাল থাকে? শুকতারা কল্যাণ সংস্থার নির্বাচন অনুচ্ছেদে স্পষ্টই উল্লেখ আছে নির্বাচন হতে হবে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। নির্বাচনের পূর্বে সাধারণ সম্পাদক ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে সকল সদস্যদের জ্ঞাতার্থে সংস্থার নোটিশ বোর্ডে লাগাবেন। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে সভানেত্রী পদত্যাগ করবেন। এলাকার গণমান্য ব্যক্তি সমন্বয়ে ৩ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু কোন কিছুই তো হয়নি। তাহলে কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
একটি সূত্র জানায়, বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ময়মনসিংহ নগরে সমাজসেবা কার্যালয়ে কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে পূর্বের কমিটি নিয়মনীতি না মেনে নবায়ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গত মার্চ ২০১৮ তে শুকতারা কল্যাণ সংস্থার সদস্য অনোয়ারা বেগম আনু অন্যান্য সদস্যদের পক্ষ থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সহ বিভিন্ন দপ্তরে সংস্থার দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন প্রদান ও বর্তমান সভানেত্রীর স্বেচ্ছাচারিতা, নির্যাতন, অনিয়ম, র্দূনীতি নিয়ে দরখাস্তে সংস্থার ১০০ জন সদস্য স্বাক্ষর প্রদান করে। “গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কোন কাজে সংগঠনের লাইসেন্স বাতিল করার আইন রয়েছে।” কিন্তু সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তার অসহযোগিতার কারণে এর আলোর মুখ দেখিনি।
একটি সূত্র জানায়, বেশ কয়েক বছর যাবৎ নগরের সমাজসেবা কার্যালয়ের কোন কর্মকর্তা শুকতারা কল্যাণ সংস্থা পরিদর্শন করে যায়নি। যদি নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যর্থতার পরিচয় প্রদান করে তাহলে কেন লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। বছরে ৫০০ টাকা রাজস্ব আদায় করার জন্যই কি শুকতারা কল্যাণ সংস্থার লাইসেন্স এখন বহাল রাখা হয়েছে? নাকি এর পিছনেও লুকিয়ে আছে কোন রহস্য।

