তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন,কটিয়াদী উপজেলা নির্বাচন স্থগিতের নেপথ্যে কাহিনী
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ৮টি কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সীল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার ঘটনায় উক্ত নির্বাচন স্থগিত করতঃ নির্বাচন কমিশন ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) কামাল উদ্দিন বিশ্বাসকে আহবায়ক, ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডলকে সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব (সংস্থাপন-২) মোঃ শাহ আলমকে সদস্য-সচিব করা হয়েছে। কমিটি ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। কমিটির কার্যপরিধি হিসেবে প্রকৃত ঘটনার উদঘাটন, ঘটনার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করণ, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নির্ধারণ, বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ প্রণয়ন এবং উক্ত অনিয়ম সম্পর্কে অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক তানিয়া সুলতানা হেপী উপজেলা চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন নিয়েছেন। তৃণমূলের মতামতকে উপেক্ষা, স্থানীয়ভাবে জনসম্পৃক্তা না থাকা স্বত্বেও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে মনতুষ্ট করে মনোনয়ন বাগিয়ে আনেন বলে একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়।
রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে কটিয়াদী উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করেন।
নির্বাচনের পূর্ব রাত্রে ৩৬ নং চান্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২৯১৮ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট, ৩৭ নং চান্দপুর বড়বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৫১৭ ভোটের মধ্যে ১২০০ ভোট, ৩৮ নং চান্দপুর হাজীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২১৬৭ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট, ৩৯ নং মন্ডলভোগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩২৮২ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট, ৬৪ নং ভূনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৫৬৩ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট, ৮৫ নং চাতল বাগহাটা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৮৯৭ ভোটের মধ্যে ৮০০ ভোট, ৮৬ নং চাতল বাগহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৯৪১ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট ও ৮৮ নং মুমুরদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন কেন্দ্রে ২৩৭৩ ভোটের মধ্যে ১০০০ ভোট সিল মেরে ব্যালট বাক্স ফেলে রাখে।
বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ অবহিত হয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের নজরে আনলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
তিনি এ বিষয়টি অবহিত করার পর নির্বাচন কমিশন কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন।
এদিকে কটিয়াদী উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর থেকে এলাকায় উক্ত নির্বাচন নিয়ে সরস আলোচনা সর্বত্র রয়েছে। ঘটনার মূল নায়ক সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাড. সোহরাব উদ্দিন। তাকে এ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন না দেয়ায় এ ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত।
তিনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তানিয়া সুলতানা হেপিকে জয়লাভ করানোর জন্য ভোট গ্রহণের পূর্ব রাতে মিশন হিসেবে এ কাজ করেন। তার এ অপকর্মের সহযোগী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শফিকুল ইসলাম ও সাবেক পাকুন্দিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ও বর্তমানে কটিয়াদী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শামছুদ্দিনকে কাজে লাগান। অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের আগের রাতে সীল মেরে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন।
এই শামসুদ্দিন পাকুন্দিয়া থানায় কর্মরত থাকাবস্থায় এমপির নির্দেশে সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি ও তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জনরোষ থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি সরকারি বিধি উপেক্ষা করে আগে পিছে পুলিশের পাহারা দিয়ে সাবেক এমপি সোহরাব উদ্দিনের আসা যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শফিকুল ইসলাম ৩ বছরের অধিককাল কিশোরগঞ্জে কর্মরত রয়েছেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবী করলেও যুদ্ধাপরাধীদের সাথে তার বিশেষ সখ্যতা রয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য সোহরাব উদ্দিন ১৯৭১ সনে পাকুন্দিয়া থানার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের ছাত্রসংঘের সহ-সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, হত্যা, ধর্ষণ ও হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করাসহ মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অপরদিকে একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ৪ নং এগারসিন্দুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান মোঃ মতিউর রহমান সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে তিনি কাজ করেন।
বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী দিয়ে সাধারণ জনগণকে লাঠিপেটা করে কেন্দ্র ফাঁকা করে লোকজন দিয়ে সীল মেরে মতিউর রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করান। কারণ মতিউর রহমানের পুত্র শামছুল আলম ফেনী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত এবং তার ব্যাচ মেট ছিলেন। তাছাড়াও জনশ্রুতি রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শফিকুল ইসলাম একজন বর্ণচোরা ও রমনী মোহন। ফলে সরকার বা দলের নির্দেশ না থাকলেও তিনি উপযাজক হয়ে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর জন্য এ কাজটি করেছেন।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি উক্ত এলাকার ভোটার এ্যাড. মিয়া মোঃ ফেরদৌস বলেন, সরকার যেখানে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট প্রত্যাশা করে সেখানে প্রশাসনের ঘাপটি মারা শয়তানেরা ভোটের আগের দিন ভোট দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তাদের কঠোর শাস্তি দাবী করেন।
অপর দিকে কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী তানিয়া সুলতানা হেপী ২৫ মার্চ দুপুরে কটিয়াদী প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন ৫ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নির্বাচন স্থগিত করায় তাঁর পদত্যাগ দাবী করেন।
এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব মোঃ আইনুদ্দিন সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

