নিউজ ডেস্ক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দম্পতিকে ডেকে স্বামীকে আবাসিক হলে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান সাগর, সাগর সিদ্দিক ও হাসানুজ্জামান।
গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) আব্দুল্লাহিল কাফি। এর আগে শনিবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফি বলেন, ভুক্তভোগীর স্বামী ওই দিন রাতেই বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় মোস্তাফিজ ও মামুনুর রশীদকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে মারধর ও আসামিদের পালাতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভুক্তভোগীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
এদিকে এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছেন। শনিবার রাতে ১০টার পরে ধর্ষণের ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজানির পর থেকেই মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে জড়ো হতে থাকেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানেই তারা সমাবেশ করেন এবং ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এ সময় ৩ দফা দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। দাবিগুলো হলো: ১ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদী হয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করা, ৩ দিনের মধ্যে হলগুলোতে অবস্থানরত অছাত্রদের বের করা এবং এ ঘটনায় প্রক্টর, প্রভোস্টের ভূমিকা স্পস্টকরণ করা। এ সময় বিক্ষোভ মিছিলে প্রায় চার শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল্লা ভূঁইয়া বলেন, ‘আপনারা জানেন এক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থাকলেও তার কোনো সঠিক বিচার হয়নি। কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে থাকে একটা যোগাযোগ, একটা কার্যকারণিক সম্পর্ক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অপরাধের বিচার হয় না। এই ঘটনায় দেশব্যাপী আমার ক্যাম্পাসকে, আমার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পত্রিকার মাধ্যমে লজ্জিত হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করায় আমিও অপমানিত হয়েছি। এই ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয় এবং কোনো ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে যারা এই ছলচাতুরীর আশ্রয় নেবে- তাদের আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করব।’
দর্শন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘আমরা কয়েকটি দাবি জানিয়েছি। যতক্ষণ না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আন্দোলনে থাকব।’
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এবং দ্রুত সময়ে বিচারের দাবিতে দুটি পৃথক মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের সড়কে এ মানববন্ধন করে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে একই স্থানে দুপুর ১টার দিকে মানববন্ধন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সনদ স্থগিত ও ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রোববার অনুষ্ঠিত হওয়া সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিন্ডিকেটের সিদ্বান্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও মো. হাসানুজ্জামানের সিন্ডিকেটের তারিখ থেকে সনদ স্থগিত ও ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। মো. মুরাদ হোসেন, মো. সাব্বির হোসেন সাগর ও এ এস এম মোস্তফা মনোয়ার সিদ্দিকীর সিন্ডিকেটের তারিখ থেকে সাময়িক বহিষ্কার ও সনদ স্থগিত করা হয় এবং ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় এবং শাহ পরানের সিন্ডিকেটের তারিখ থেকে তার সনদ স্থগিত করা হয়।
এ ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন: অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার, অধ্যাপক ড. ছায়েদুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আফসানা হক এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার (আইন) মাহতাব-উজ-জাহিদ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সনদ স্থগিতের পাশাপাশি তাদেরকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও অস্থায়ী দোকানপাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অছাত্রদের আবাসিক হল থেকে বের হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে। তারা বের না হলে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসে অনুমোদনহীন রিকশা চলাচলও বন্ধ করা হয়েছে।’ গঠিত কমিটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, শনিবার জাবির আবাসিক হলে স্বামীকে আটকে রেখে নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ও বহিরাগত এক যুবকের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হল-সংলগ্ন জঙ্গলে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের (৪৫তম ব্যাচ) ছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান ও বহিরাগত যুবক মামুন। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ।

