সুমন ভৌমিকঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ৪১ পূরণের লক্ষমাত্রা নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগকে সর্ম্পূণ স্বচ্ছতার সহিত ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করতে পুলিশ বিভাগকে আইজিপি কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আইজিপির কঠোর ভূমিকায় ময়মনসিংহের পুলিশ বিভাগ কনস্টেবল পদে প্রার্থীগণের শারীরিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের শর্ত সাপেক্ষে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে অত্যন্ত স্বচ্ছতায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। যা মূল নেতৃত্বে ছিলেন ময়মনসিংহের সুযোগ্য পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন বিপিএম (বার)।
ময়মনসিংহ জেলায় এক সময় “অর্থ ছাড়া চাকুরী” সেটা ছিল স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করে হতদরিদ্র পরিবার গুলোর মাঝে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন। তিনি সরকার নিধারিত ১শত টাকার ট্রেজারি চালান ও ৩ টাকার ফরমে সৌভাগ্য ২৫৭ জন পুরুষ ও মহিলাকে সম্পূর্ন স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কনস্টেবল পদে চাকুরীর সুযোগ করে দিয়েছেন।
আধুনিক বাংলাদেশ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের স্বচ্ছতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসপি শাহ আবিদ নিজে উপস্থিত থেকে ৬ হাজার ২ শ ৮০ জন নারী-পুরুষ এর মধ্য থেকে শারীরিক, লিখিত, মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ যোগ্যতা ও মেধা তালিকার ২৫৭ জন ট্রেইনি রিক্রুট এর জন্য মনোনীত করেন। যার কৃতিত্বের অধিকারী ময়মনসিংহের বর্তমান এসপি শাহ আবিদ। তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজে নিয়োজিত সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
তিনি কোন ধরনের আর্থিক লেনদেন করে প্রতারিত না হওয়ার জন্য সকল চাকুরী প্রত্যাশীদের আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এর পূর্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মাইকিং করে প্রচারনা চালিয়েছিলেন।
ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন্স-এ বিনা পয়সায় ট্রেইনি রিক্রুট কনষ্টেবল নিয়োগ চুড়ান্তভাবে উর্ত্তীন তালিকার নাম প্রকাশ হওয়ায় কৃতিত্বের অধিকারী এসপি শাহ আবিদ ময়মনসিংহ পুলিশ বিভাগে প্রথমবার সততার ধীরতাপূর্ন সাহসীকতার মাইলফলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ময়মনসিংহ জেলায় পুলিশ নিয়োগে স্বরণকালের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়েছে। পুলিশের চাকরী সোনার হরিন নামে খ্যাত, যোগ্যতা বলে পাওয়ায় সাধারন মানুষের মাঝে সরকারের দূর্নীতি মুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এটা প্রথম স্ট্যাপ বলে জনগণ আশায় বুক বেঁধেছেন। এছাড়াও ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন একজন সৎ ও দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে জনগনের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৫৭ জন চুড়ান্ত ভাবে উর্ত্তীণ প্রার্থীদের অভিভাবকদের পেশা জানা গেছে। ৭৬ জন প্রার্থীর অভিভাবক নিজ জমিতে কৃষি কাজ করে, ১৮ জন প্রার্থীর অভিভাবক অন্যের ও নিজের জমিতে কাজ করে, ৩০ জন প্রার্থীর অভিভাবক অন্যের জমিতে কাজ করে, ১০ জন প্রার্থীর অভিভাবক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ৩ জন প্রার্থীর অভিভাবক দিনমজুরের কাজ করে, ৪ জন প্রার্থীর অভিভাবক অবসর প্রাপ্ত সরকারী চাকরীজীবি, ২৩ জন প্রার্থীর অভিভাবক অবসর প্রাপ্ত পুলিশ সদস্য, ১৭ জন প্রার্থীর অভিভাবক কর্মরত পুলিশ সদস্য, ৪ জন প্রার্থীর অভিভাবক শিক্ষক, ২ জন প্রার্থীর প্রার্থীর অভিভাবক বাবুচি, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক গ্রাম পুলিশ, ২ জন প্রার্থীর অভিভাবক অটোচালক, ১২ জন প্রার্থীর অভিভাবক মুক্তিযোদ্ধা ভাতার উপর নির্ভরশীল, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক চা বিক্রেতা, ৩ জন প্রার্থীর অভিভাবক কাঠ মিস্ত্রী, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক কলা বিক্রেতা, ৪ জন প্রার্থীর অভিভাবক রিক্সাচালক, ৫ জন প্রার্থীর অভিভাবক সবজী বিক্রেতা, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক রং মিস্ত্রী, ৫ জন প্রার্থীর অভিভাবক গার্মেন্টস কর্মী, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক তাঁত শ্রমিক, ৬ জন প্রার্থীর অভিভাবক সরকারী চাকরীজীবি, ৮ জন প্রার্থীর অভিভাবক বেসরকারী চাকরীজীবি, ৫ জন প্রার্থীর অভিভাবক প্রবাসী, ৩ জন প্রার্থীর অভিভাবক পল্লী চিকিৎসক, ৫ জন প্রার্থীর অভিভাবক মুদি দোকানদার, ২ জন প্রার্থীর অভিভাবক স্কুলের দপ্তরী, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক গাড়ীর হেলপার, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক নরসুন্দর এবং ২ জন প্রার্থী নিজেরা বাসাবাড়িতে শিক্ষকতা করে ও ১ জন প্রার্থী নিজেই গার্মেন্টস কর্মী।
এছাড়াও অপেক্ষমান ৪৫ জন প্রার্থীর অভিভাবকদের পেশা, ৯ জন প্রার্থীর অভিভাবক নিজ জমিতে কৃষি কাজ করে, ৫ জন প্রার্থীর অভিভাবক অন্যের ও নিজ জমিতে কাজ করে, ৮ জন প্রার্থীর অভিভাবক অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করে, ৪ জন প্রার্থীর অভিভাবক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ২ জন প্রার্থীর অভিভাবক দিনমজুর, ৭ জন প্রার্থীর অভিভাবক অবসর প্রাপ্ত পুলিশ সদস্য, ৭ জন প্রার্থীর অভিভাবক কর্মরত পুলিশ সদস্য, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক শিক্ষক, ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক কাঠ মিস্ত্রী ও ১ জন প্রার্থীর অভিভাবক ফল বিক্রেতা।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, শারীরিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণে কোন প্রকার অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অপশক্তির প্রয়োগ ছাড়া ১শ ৩ টাকা খরচে স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে গত ৮ জুলাই চুড়ান্তভাবে ২৫৭ জন কনষ্টেবল নিয়োগ পেয়েছে। আর সেই সুবাদে রিকশাচালক ওমর ফারুকের মেয়ে ফারজানা আক্তার সুমি, আয়রন দোকানদার ফজলে রাব্বী, এতিম কাজল মিয়া, মাহফুজুর রহমান সহ পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি প্রাপ্তদের বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা সুযোগ পেয়েছেন। চাকরি প্রাপ্তদের অনেকের বাবা নেই অথবা কারোর মা নেই। খেয়ে না খেয়ে জীবনের সঙ্গে লড়াই সংগ্রাম করে পড়াশুনার খরচ চালিয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে বিনা অর্থে সোনার হরিণ (সরকারী চাকরি) হাতে পেয়েছে।
পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি প্রাপ্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মধ্যে, হতদরিদ্র ফারজানা আক্তার সুমি, কাজল মিয়া, মাহফুজুর রহমান ও ফজলে রাব্বী তাদের আনন্দানুভূতির কথা জানতে গিয়ে কেউ কেউ আনন্দাশ্রু ঝড়ান এবং আনন্দানুভূতির কথা প্রকাশ করেন।
সুমি’র আনন্দানুভূতি……..
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সুহিলা গ্রামের রিকশা চালকের মেয়ে ফারজানা আক্তার সুমি। স্বপ্ন ছিল পুলিশে চাকরী করার। হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন পুলিশে চাকরি পেতে কোনো টাকা-পয়সা লাগেনা। আবেদন ফরম পূরণ করে গত ১ জুলাই ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে দাঁড়ালেন ফারজানা আক্তার সুমি। সুমি আনন্দের অশ্রু ঝড়িয়ে বলেন, আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এবারই প্রথম পুলিশে চাকরীর জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। ১০০ টাকার বাইরে কোন টাকা খরচ না করে চাকরী পেলাম। এ নিয়োগ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এখন তাদের আর অভাব-অনটন থাকবে না। চাকরির বেতন দিয়েই মা-বাবাকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন-যাপন করতে পারবো। আমার বাবা সৃষ্টিকর্তার কাছে এসপি সাহেবের জন্য দোয়া করেছেন।
কাজল মিয়া’র আনন্দানুভূতি……..
তারাকান্দা উপজেলার বকশীমুল এলাকার দারিদ্র্যে ঘরে বেড়ে উঠা এতিম কাজল মিয়া বলেন, মাত্র ১০০ টাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে আমার সরকারী চাকরি হয়েছে। নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছি। কথা বলতে পারছিলাম না। আমার বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। মাকে মিষ্টিমুখ করিয়ে এ খুশির সংবাদ দেবো। বাংলাদেশ পুলিশ সদস্য হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি এবং “দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখবো”।
মাহফুজুর রহমানের আনন্দানুভূতি……..
হালুয়াঘাট উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের মাহফুজুর রহমান বলেন, ছোটবেলা থেকেই গল্প শুনেছি টাকা ছাড়া পুলিশে চাকরি হয় না। পুলিশ বদলে যাচ্ছে এবং আমরা এ বদলে যাওয়ার যুগের অগ্নিসাক্ষী। বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত সদস্য হতে পেরে দেশের মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করবো।
ফজলে রাব্বী’র আনন্দানুভূতি……..
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর ঈশ্বরদিয়া এলাকার আয়রন দোকানদার ফজলে রাব্বী বলেন, পুলিশে চাকরি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। আয়রন দোকানের আয় দিয়ে নিজের পড়াশুনার খরচ চালিয়েছি এবং আমার মা কাপড়-চোপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। খুবই কষ্টে জীবন-যাপন করতে হতো। পুলিশ বাহিনীর গর্বিত সদস্য হতে পেরে দুর্দিন কাটিয়ে উঠে ভালভাবে সংসার চালাতে পারবো। আমি এসপি স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। টাকা ছাড়া পুলিশের চাকরি এটা একটি বিরল ঘটনা।
এসময় পুলিশ লাইন্স গেটের বাইরে স্বজনদের অপেক্ষা। খুশির সংবাদে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। একঝাঁক তরুণ-তরুণী খুশিমনে বাড়ি ফিরছেন। চাকরির নজির স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী, আইজিপি ও এসপি’র প্রতি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

