সুমন ভৌমিকঃ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার আছিম বাজারের তোফায়েল আহাম্মেদকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশ হত্যা মামলা না নিলে, নিহত তোফায়েলের বোন জামাই (আবুল কালাম) বাদী হয়ে ২৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলা বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফুলবাড়িয়া ২নং আমলী আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেন।
সূত্র জানায়, ১১ অক্টোবর দিবাগত রাত সাড়ে ৯টায় ফুলবাড়িয়া থানার আছিম তিতারচালা’র নিজ বাড়ি থেকে তোফায়েল আহাম্মেদ (২৭)-কে ডেকে নিয়ে যায় আছিম বাজারের ইজারাদার এমদাদুল হক (৫০)। পরে ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশ জঙ্গলবাড়ি চকপাড়ায় ইউসুফ আলী’র মুরগীর ফার্মে একটি লাশ পড়ে আছে খবর পেলে, রাতের বেলায় পুলিশ মুরগীর ফার্ম হতে তোফায়েল এর লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
জানা যায়, ফুলবাড়িয়া উপজেলার আছিম বাজারের ইজারাদারদের মধ্যে এমদাদুল হকের সাথে তোফায়েল আহাম্মেদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তারা দু’জনই বাজার ইজারাদার ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন।
তোফায়েল এর হত্যার বিষয়ে বাদী (বড় বোন জামাই) আবুল কালাম বলেন, তোফায়েল এর লাশটি দেখার পর যে কেউ বলবে এটি হত্যাকান্ড। নিহতের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গে জখমের চিহ্ন ছিল।
তিনি বলেন, আমরা যখন ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে ফুলবাড়িয়া থানা থেকে বের হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদেশ্যে রওনা দেই, ঠিক সে সময় আমাদের অনুপস্থিতে ফুলবাড়িয়া থানার এসআই রুবেল সুকৌশলে আমার স্ত্রী নিরক্ষর মোছাঃ নাজমা খাতুন এর নিকট থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। স্বাক্ষর নেওয়ার সময় আমার স্ত্রীকে এসআই রুবেল বলেন, এই কাগজে স্বাক্ষর না দিলে তোফায়েল এর লাশ দাফনের জন্য মর্গ থেকে আনা যাবে না। এরপর ফুলবাড়িয়া থানায় হত্যা মামলা করার প্রস্তুতি নিলে ওসি মোঃ আজিজুর রহমান আমাদের জানান, আমার স্ত্রী যে কাগজে স্বাক্ষর দেয় সেই কাগজে (আমার স্ত্রী) মোছাঃ নাজমা খাতুনকে বাদী করে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়! এসআই রুবেল রহস্যজনক ভাবে হত্যা মামলা না নিয়ে আমার নিরক্ষর স্ত্রীকে দিয়ে অপমৃত্যু মামলা করায়। আমার স্ত্রী মোছাঃ নাজমা খাতুনকে জিঙ্গাসা করিলে সে বলে, আমার কাছ থেকে চালাকি করে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে।
বাদি (আবুল কালাম) অভিযোগ করে বলেন, নিহত তোফায়েলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার পরেও হত্যা মামলা নেয়নি ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশ। এসআই রুবেলের চালাকি বিষয়টি জানার পর আমি ২৫ অক্টোবর আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করি।
এসময় বাদী বলেন, তোফায়েলের লাশ ফুলবাড়িয়া থানায় আনার পর থানা পুলিশ যখন জানতে পারে নিহত তোফায়েলের লাশ যে মুরগী ফার্মে পড়ে ছিল তার পাশের বাড়ির গোয়াল ঘরে অন্ধকারে এমদাদুল নামের এক লোক আশ্রয় নেয়। বাড়ি’র মালিক এমদাদুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার কথা-বার্তায় সন্দেহ হলে আটক করে রাখে। পরে আব্দুল হান্নান, ইব্রাহিম খলিল ও শহীদুল্লাহ মেম্বার ঐ বাড়ি থেকে আটক এমদাদকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। এ সংবাদে থানা পুলিশ ইজারাদার এমদাদুল হককে আটক করে ফুলবাড়িয়া থানায় নিয়ে আসে। কিন্তু ফুলবাড়িয়া থানা’র ওসি মোঃ আজিজুর রহমান হত্যা মামলা না নিয়ে রহস্যজনক কারনে ইজারাদার এমদাদুলকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়।
নিহত তোফায়েলের বড় বোন মোছাঃ নাজমা খাতুন বলেন, ফুলবাড়িয়া থানায় যাওয়ার পর থানা পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তে জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। আমি ছাড়া আমার আত্মীয়-স্বজনরা যখন লাশের গাড়ীর সাথে যায়, তখন রুবেল দারোগা টাইপ করা একটি লিখিত কাগজ এনে আমাকে বলে এখানে স্বাক্ষর না দিলে হাসপাতাল থেকে লাশ আনা যাবে না। আমি মূর্খ, রুবেল দারোগার কথা শুনে কাগজে স্বাক্ষর করি। পরে জানতে পারি ঐ কাগজে আমাকে বাদী করে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়।
নিহত তোফায়েল এর স্ত্রী ডলি আক্তার বলেন, ১১ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টায় ইজারাদার এমদাদুল (৫০) আমার স্বামীকে মিটিং করার কথা বলে আমার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এসময় আমার ঘরের বাহিরে আরও দু’জন অপরিচিত লোক অপেক্ষা করছিলো। আমার স্বামী বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে তার সাথে ফোনে শেষ কথা হয়। পরে শুনতে পারি আমার স্বামী খুন হয়েছে।
স্ত্রী আরও বলেন, আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে ইজারাদার এমদাদুল ও তার লোকজন মিলে হত্যা করেছে। ভোরে লাশ যখন আনা হয়, তখন দেখতে পাই বাম হাতে কনু’র মাঝে আঘাতের চিহ্ন ও মাথার চিপে আঘাতের চিহ্ন এবং লাশের মাথার পিছনের দিকটা রক্তাক্ত জখম ছিল।
আছিম বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল হক বলেন, আমি দোকানদারী করছিলাম। এসময় জসিম আমার কাছে এসে বলে, তোফায়েল নামে কাউকে চিনেন? আমি শুনেছি তোফায়েল নামে একটি লোকের লাশ জঙ্গলবাড়ি চকপাড়ায় একটি ফার্মে পড়ে আছে। এসময় জসিম বলে, লোকটি মোটা-তাজা, মাথায় চুল নেই এবং হোন্ডারের চাবি আর মোবাইল পড়ে আছে লাশের পাশে। জসিমের কাছে বিষয়টি জানার পর আমরা কয়জন ভ্যানে করে ঘটনাস্থলে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি নিহত ব্যক্তিটি আছিম বাজারের ইজারাদার তোফায়েল। তার বাম হাতের কনুতে আঘাতের চিহ্ন, কপালের চিপে আঘাত এবং মাথার পিছনে রক্তাক্ত জখম ছিল। ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি রাত্রে ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ি’র গোয়াল ঘরে এমদাদুল হক নামে এক লোক আশ্রয় নিয়েছে, তার কথা-বার্তায় সন্দেহ হলে আটকে রাখে বাড়ির মালিক। পরে আব্দুল হান্নান, ইব্রাহিম খলিল ও শহীদুল্লাহ মেম্বার ঐ বাড়ি থেকে এমদাদকে ছাড়িয়ে আনে। ঘটনাস্থলে গিয়ে আরো দেখি পাশের বাড়ির এক মহিলা (রমিছা খাতুন) তখন পুলিশকে বলছে, একটি গুংগানি শব্দ পেয়ে আমি বের হয়েছি। প্রথমে ভেবেছিলাম গরুর শব্দ, অনেকক্ষণ পরে দেখি একটি লাশ মুরগীর ফার্মের ভিতর পড়ে আছে।
মোঃ আবু সাঈদ বলেন, আমি ঐদিন রাত্রে আছিম বাজারে ছিলাম। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুনি তোফায়েল খুন হয়েছে জঙ্গলবাড়ি চকপাড়া’র একটা ফার্মের ভিতর। তারপর ওখানে গিয়ে দেখতে পেলাম তোফায়েল এর লাশ একটি মুরগীর ফার্মের মধ্যে পড়ে রয়েছে। নিহত তোফায়েলের কাপড় ভিজা, হাত ফোলা, কপালের চিপে আঘাত ও মাথার পিছন দিকে রক্তাক্ত জখম এবং বুঝা যাচ্ছে এটি হত্যাকান্ড। এসময় দেখি একটি মহিলা এসে বলছে, এই লোকটি মৃত্যুর আগে সে গুংগানি শব্দ শুনতে পায়। ঐ মহিলাটি আরও বলছে, প্রথমে সে ভেবেছিল গরুর শব্দ, অনেকক্ষণ পরে দেখে মুরগীর ফার্মে একটি লাশ পড়ে আছে। মহিলাটি লাশ দেখার পর ভয়ে চিৎকার করলে মানুষ জড়ো হয়ে যায়। এরপর লোকজন ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশকে খবর দিলে কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে।
মোঃ এনামুল হক বলেন, আমি মোবাইলের মাধ্যমে জানতে পারলাম আমার মামা (তোফায়েল) জঙ্গলবাড়ি চকপাড়া’র একটি ফার্মের ভিতর লাশ হয়ে পড়ে আছে। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি নিহত তোফায়েল এর কপালের চিপের দিকে আঘাত, বাম হাতের কনুতে আঘাতের চিহ্ন এবং মাথার পিছনে রক্তাক্ত জখম। এনামুল জানান, নিহত তোফায়েল এর রক্তাক্ত জখম দেখে বুঝা যায় কেউ খুন করেছে। এসময় এক মহিলা এসে বলছে, সে একটি গুংগানি শব্দ শুনে বের হয়, অনেকক্ষণ পড়ে দেখে ফার্মের ভিতর একটি লাশ পড়ে আছে। এরপর সে লাশ দেখে ভয়ে চিৎকার করলে লোকজন জড়ো করে।
উল্লেখ্য, তোফায়েল হত্যার বিচার দাবিতে আছিম বাজারে পৃথক পৃথক দিনে মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিছিল ও মানববন্ধনে শত শত এলাকাবাসী অংশগ্রহন করেন।

