সুমন ভৌমিক :
ময়মনসিংহ নগরীতে নামী-দামী হোটেল-রেস্তোঁরায় বকরী, ছাগল, বাচ্চা ছাগল বা মরা ছাগল অথবা রোগাক্রান্ত বকরী বা ছাগল দিয়েই চলছে খাসীর কাচ্চি বিরিয়ানী। ১১শ’ টাকা কেজি দরে খুচরা বাজারে বিক্রি হয় খাসীর মাংশ। যা পাইকারী সেইসব দোকানীরা দেয় ৮শ’ টাকা দরে।
দোকানীদের ভাষ্য, হোটেল-রেস্তোঁরায় ৮শ টাকা দরে দিতে গেলে তো বকরীই দিতে হবে। না হলে আমাদের লস হবে। ‘‘লসের দিকে তাকিয়েই খাসির জায়গায় বকরী দেয়া হয়’’! হোটেল-রেস্তোঁরার মালিকগণ জেনেই নেয়। এতে সাধারণ ভোক্তারা ঠকছে প্রতিনিয়িত। এমন প্রতারণা দিন দিন বেড়েই চলছে। সিটি কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত নগরীর গরু-খাসী ও বকরী জবাই স্থানে একজন পশু ডাক্তার থাকার নিয়ম থাকলেও, তা মানা হচ্ছে না। এর ফলে ভোক্তা জেতা কিংবা মরা অথবা রোগাক্রান্ত জবাই করা খাসি, বকরী, ছাগল খাচ্ছেন কিনা তা বুঝার উপায় নেই। আর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকেও রহস্যজনক কারনে ধীর গতিতে চলছে তাদের কার্যক্রম। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করতে পারছে অনায়াসে।
গতকাল (মঙ্গলবার) ভোর সাড়ে পাঁচটায় নগরীর (পতিতাপল্লী সংলগ্ন) এবি গুহ রোডের সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত পশু জবাই স্থানে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১নং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ফাটাকেষ্ট) সহিদুল ইসলাম তার টিম নিয়ে অভিযান চালায়। তিনি সেখান থেকে ৪৯টি বকরী, ছাগল ও একটি বাচ্চা ছাগল উদ্ধার করেন। সেইসাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে খবর দিলে, তাঁরা উক্ত পশুর মালিকের কাছ থেকে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। এসময় সিটি কর্পোরেশন কতৃপক্ষ কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
ফাটাকেষ্ট সহিদুল ইসলাম যখন এ অভিযান চালায় ততক্ষনে তিনটি খাসী জবাই করে বাজারে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিধি অনুযায়ী এখানে সিটি কর্পোরেশনের পশু ডাক্তার ও জবাইকৃত পশুর গায়ে সীলমোহর দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি।
জনশ্রুত, এই সীল মোহর নাকি কিনতে পাওয়া যায়। মরা খাসী, ছাগল, বকরী, পেটে বাচ্চাওলা ছাগল ও অপরিপক্ক খাসী বা ছাগল অথবা রোগাক্রান্ত খাসী বা ছাগল এখানে জবাই হয়ে থাকে। এইসব জবাইকৃত মাংস হোটেল-রেস্তোঁরায় খাসী বলে চালিয়ে দিয়ে নগরীর বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরায় পরিবেশন করা হয়।
সমাজে এখন ভোজন রসিকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবারের লোকজনদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন হোটেল-রেস্তোঁরায় বাহারী মুখরোচক সুস্বাদু খাবার খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। নগরীতে হোটেল-রেস্তোঁরার সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। এই সকল হোটেল-রেস্তোঁরা যেমন বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভোক্তাও। এই সকল ভোক্তারা কি খাচ্ছে? জনশ্রতি রয়েছে, তারা খাচ্ছে জবাই করা বকরী, মরা খাসী, ছাগল, বকরী, পেটে বাচ্চাওয়ালা ছাগল, অপরিপক্ক খাসী বা ছাগল অথবা রোগাক্রান্ত খাসী বা ছাগল।
হোটেল-রেস্তোঁরায় মাংস সরবরাহ করে তাদের দেয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে-ময়মনসিংহ নগরীর সালতানাৎ, সারিন্দা, ধানসিঁড়ি, হাজী বিরিয়ানী, নবাবীসহ নগরীর সকল হোটেল-রেস্তোঁরায় বকরীর মাংস বিক্রি করে। আর খাসির কচ্চি বিরিয়ানি বলে প্রতারণা করছে সেই সকল হোটেল-রেস্তোঁরা মালিকারা। এই প্রতারণায় একটা ব্যাপক অংশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পেয়ে থাকেন বলেও প্রচার রয়েছে।
সরবরাহকারীরা জানায়, খুচরা বাজারে ১১শ’ টাকা কেজি দাম থাকলেও এই সকল মাংস পাইকারী দরে হোটেল-রেস্তোরা মালিকরা কিনে নেয় ৮শ’ টাকায়। তাই আমাদের বকরী দেয়া ছাড়া কি করার আছে। হোটেল-রেস্তোঁরার মালিকরা জেনেই তা নিয়ে থাকেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক আব্দুস সালাম জানান, আমরা খবর পেয়ে ছুটে আসি। ৩ হাজার টাকা জরিমানা করে তাদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে। আগামীতে দেখে শুনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিনিয়ত হোটেল-রেস্তোঁরায় বকরীর মাংস খাইয়ে দিয়ে খাসীর কাচ্চি বিরিয়ানির দাম নিয়ে প্রতারণা করছে, এটির বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নিবেন কিনা সহকারি পরিচালক আব্দুস সালাম কাছে জানতে চাইলে, তিনি প্রতিবেদককে বলেন, তথ্য প্রমাণ সহকারে হোটেল-রেস্তোঁরার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানায়, ৩ হাজার টাকা জরিমানা কি ভাবে হয়! ৪৯টি ছাগলের জন্য ৩ হাজার টাকা একেবারে কম হয়ে গেছে। ভোক্তা অধিকার কবে কখন কিকি অভিযান চালিয়েছে তা নগরবাসী জানতে চায়। অনেকে ক্ষোভে বলেন, নিয়মিত মাসোহারা পায় বলেই কম জরিমানা করেছে।
অভিযানের সময় উৎসুক জনতারা জানায়, এই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাথে মাংস ব্যবসায়ী ও হোটেল-রেস্তোঁরার মালিকদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিমাসে তারা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মাসোহারা দিয়ে থাকেন। এই মাসোহারার কারনে কতৃপক্ষ মাংস ব্যবসায়ী ও হোটেল-রেস্তোঁরায় অভিযান বন্ধ করে দিয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যদি শতভাগ স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হয় তবে মাংস দোকানে ও হোটেল-রেস্তোঁরায় ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতি সপ্তাহে পরিচালিত হয় না কেন? যদি প্রতি সপ্তাহে হয় তবে কেউ ভোক্তা অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
ফাটাকেষ্ট সহিদুল ইসলামের এমন অভিযান অব্যাহত থাকুক নগরবাসীর প্রত্যাশা।

