প্রিন্টিং বা মুদ্রণ বলতে আমরা সাধারণত কাগজের উপর কালি বা লেজার দিয়ে কোনো ছবি বা লেখা ছাপানোকে বুঝি। কিন্তু বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এ যুগে প্রিন্টিং শুধু দ্বিমাত্রিক কাগজের উপর সীমাবদ্ধ নেই। থ্রিডি গ্রাফিক্স, থ্রিডি মডেলিং, থ্রিডি এনিমেশনের সাথে তাল মিলিয়ে প্রিন্টিংও এখন থ্রিডিতে উন্নীত হয়েছে।
থ্রিডি প্রিন্টিং হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কম্পিউটারে ডিজাইন করা ডিজিটাইল ফাইল থেকে ত্রিমাত্রিক বস্তু তৈরি করা হয়। সাধারণত ডিজাইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পদার্থের একের পর এক সূক্ষ্ম আনুভূমিক আস্তরণ বা প্রলেপ স্থাপনের মাধ্যমে বস্তুটি তৈরি করা হয়।
প্রথমদিকে থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র প্লাস্টিকের বস্তু তৈরি করা গেলেও দিনে দিনে এর ব্যবহার বিস্তার লাভ করছে। বর্তমানে প্লাস্টিক ছাড়াও স্টিল, কনক্রিট, ফাইবারসহ বিভিন্ন পদার্থের বস্তুও থ্রিডি প্রিন্টিং পদ্ধতিতে তৈরি করা সম্ভব। অন্য অনেক ক্ষেত্রের পাশাপাশি নির্মাণ শিল্পও সম্প্রতি থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের যুগে প্রবেশ করেছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক, স্টিল এবং কনক্রিটের কয়েকটি সেতু।
সম্প্রতি থ্রি ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির সাহায্যে এবার একটা বড়সড় ব্রিজ বানিয়ে চমকে দিয়েছে চিন। ৮৬ ফুট দৈর্ঘ্যের এই ফুটব্রিজটি সাংহাইয়ের বাওশান জেলায় অবস্থিত। এটাই বিশ্বের দীর্ঘতম থ্রি ডি প্রিন্টিং ফুটব্রিজ। ব্রিজটা তৈরি করতে লেগেছে ১৭৬ কংক্রিট ইউনিট। ব্রিজের অংশগুলো প্রথমে বানানো হয়েছিল দুটো বিশালাকার থ্রি ডি প্রিন্টিং মেশিন দিয়ে। যে যন্ত্রটা দিয়ে এই ব্রিজটা বানানো হয়েছিল, সেটার ওজন ৫ হাজার ৮০০ কেজি। মেশিনটা কিনতে খরচ পড়েছিল ২৮ লক্ষ ডলার। চিনের সবচেয়ে পুরনো ব্রিজ আঞ্জি। ১৪০০ বছরের পুরনো ব্রিজ এটি। এই ব্রিজের আদলেই বানানো হয়েছে থ্রি ডি প্রিন্টিং ব্রিজটি।
ব্রিজটার নকশা বানিয়েছেন জয়না বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল আর্কিটেকচার বিভাগ আর ব্রিজটা নির্মাণ করেছে সাংহাই উইসডম বে ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। শুধুমাত্র ব্রিজের অংশগুলো বানাতে সময় লেগেছিল টানা ১৯ দিন। এই ভাবে থ্রি ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির সাহায্যে ব্রিজ তৈরিতে খরচ অনেকটাই কম বলে জানিয়েছেন জয়না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিদরা।
তবে এটাই বিশ্বের একমাত্র থ্রি ডি প্রিন্টিং ব্রিজ নয়। বিশ্বের প্রথম থ্রিডি প্রিন্টেড ব্রিজ নির্মিত হয় স্পেনের অ্যাক্লোবেন্দাসে। রাজধানী মাদ্রিদের দক্ষিণে অবস্থিত অ্যাক্লোবেন্দাস শহরের কাস্তিলা লা মাঞ্ছা পার্কে এই সেতুটির উদ্বোধন করা হয় ২০১৬ সালের ১৪ই ডিসেম্বরে। ১২ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১.৭৫ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট এই সেতুটি মূলত একটি পদচারী সেতু, যা পার্কটির একটি কৃত্রিম জলাধারের উপর স্থাপিত।
২০১৬ সালেই নেদারল্যান্ডসে ত্রিমাতৃক মুদ্রণের মাধ্যমে আরেকটি কনক্রিটের সেতু নির্মাণ করা হয়, যা মানুষের পাশাপাশি সাইকেল আরোহীদের জন্যও উপযোগী। নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর গেমার্টে অবস্থিত এই সেতুটির দৈর্ঘ্য ৮ মিটার এবং প্রস্থ সাড়ে ৩ মিটার। এটি প্রায় ৮০০টি স্তরের মাধ্যমে মুদ্রিত হয়েছিল। এতে রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে স্টিলের ক্যাবল ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মুদ্রণ কাজে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল।
চীনের সাংহাইয়ের টংজি ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য এবং নগর পরিকল্পনা অনুষদ, তাদের ভবনের সামনে থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি প্লাস্টিকের দুটি সেতু স্থাপন করেছে। এদের একটির দৈর্ঘ্য ১১ মিটার, যা ছোট একটি জলপ্রবাহ এবং গাছপালার উপর দিয়ে স্থাপিত। অন্য সেতুটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ মিটার, এবং সেটি শুধু পানির উপর স্থাপিত। বড় সেতুটিতে প্লাস্টিকের তৈরি সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে। অন্যদিকে ছোট সেতুটি সম্পূর্ণ সমতল। মুদ্রণে সময় লেগেছে মাত্র ৩৬০ ঘন্টা।
নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামের বিখ্যাত রেড লাইট শহরের একটি খালের উপর থ্রিডি প্রিন্টেড স্টিলের ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু হয় আরও কয়েক বছর আগে। প্রচলিত থ্রিডি প্রিন্টারগুলো তাদের অত্যন্ত উচ্চাকাংখী এই সেতুটি মুদ্রণে সক্ষম না হওয়ায় তারা নিজেরাই এর জন্য বিশেষ থ্রিডি প্রিন্টার এবং সফটওয়্যার তৈরি করেন। তাদের তৈরি এই সফটওয়্যার, প্রিন্টারের এক্সট্রুডার থেকে কপার এবং অ্যালুমিনিয়ামের গলিত মিশ্রণ একটি ছয় হাত বিশিষ্ট রোবটের কাছে প্রেরণ করে, যা স্টিলের লাইনের পর লাইন তৈরির মাধ্যমে শূন্য থেকে ব্রিজটি নির্মাণ করে তোলে। ২০১৮ সালেই এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।
থ্রিডি প্রিন্টিং ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যেখানে খালি চোখে আসল আর নকলের মধ্যে তফাত বোঝার জো নেই৷ জার্মান বিজ্ঞানীরা এক বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে নকলের মান আরও উন্নত করে তুলেছেন।

