বাড়ছে বজ্রপাত, বাড়ছে মৃত্যুও

Date:

দেশে জলবায়ু পরিবর্তনগত কারণে আগের তুলনায় বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। এর সাথেসাথে বেড়েছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও।

ফিনল্যান্ডের ভাইসেলা ইনকরপোরেশন তাদের ‘জিএলডি ৩৬০’ স্যাটেলাইট থেকে গ্লোবাল লাইটিং সিস্টেম অনুসরণ করে সারাবিশ্বের বজ্রপাতের পরিমাপ করে।

তাদের গত ছয় বছরের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশের আকাশসীমায় গড়ে ৭ লাখ ৮৬ হাজার বজ্রপাত হচ্ছে। এরমধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ বা দুই লাখের বেশি বজ্রপাত আকাশ থেকে মাটিতে পতিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণ আছে। সেগুলো হলো- বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রায় তিন সপ্তাহের কাছাকাছি সময় ধরে একটি হিটওয়েভ স্থায়ী হয়েছে, যা এর আগে কখনোই হয়নি। এই হিটওয়েভ বজ্রপাত বাড়ানোর পেছনে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। আরেকটি কারণ হলো বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি। প্রচণ্ড গরমে আমাদের নদীনালায় থাকা পানি বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে গিয়ে মেঘে আর্দ্রতা বাড়াচ্ছে। মেঘে আর্দ্রতা বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে।

এর সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারের চার্জ ও বায়ুদূষণ অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরায়ণের ফলে যে বিপুল তাপ সৃষ্টি হচ্ছে এ কারণে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। এ ছাড়া বড় বড় গাছ কেটে ফেলায় বজ্রপাতে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বজ্রপাতের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে ক্ষতির পরিমাণও বাড়ে। বজ্রপাতে কয়েক মিলি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বা ৮০০ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবাহিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও ভিকটিম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বজ্রপাতের এখনকার পরিস্থিতি আর হ্যাজার্ডের পর্যায়ে নেই। এটি এখন পুরোপুরি ডিজাস্টারে রূপান্তরিত হয়েছে।দুই দশক ধরে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগে এত বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়নি, বজ্রপাতে যত মানুষ মারা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত এক দশকে বজ্রপতে দেশে ২ হাজার ৯০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গত তিনমাসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০০ জনের। ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৯৮, ২০২০ সালে ২৫৫, ২০২১ সালে ৩১৪, ২০২২ সালে ৩৪৬ এবং ২০২৩ সালে ৩৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রের অপঘাতে। বজ্রপাতে মৃত্যুর এ সংখ্যা এসময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটে যাওয়া এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এ ছাড়া বজ্রপাতে আহত হয়ে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের পক্ষাঘাত, দুর্বলতা, মাথাঘোরা, স্মৃতিশক্তি এবং যৌনশক্তি হ্রাসের মতো উপসর্গ নিয়ে বাঁচতে হয়।

সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী হেলিয়নে প্রকাশিত গবেষণা ‘বাংলাদেশে বজ্রপাত পরিস্থিতির ওপর জিআইএসভিত্তিক স্থানিক বিশ্লেষণে’ বলা হয়েছে, বেশিরভাগ প্রাণহানি বর্ষা-পূর্ববর্তী মৌসুম এবং বর্ষা ঋতুতে, যার মধ্যে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

এতে আরও বলা হয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরন ও বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ এবং ঋতু পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটছে। এ কারণেই বজ্রপাত বাড়ছে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাত বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার পরিধিও।

দেশের যেসব অঞ্চলে আগে খুব একটা বজ্রপাত হতো না, সেখানে এখন বজ্রপাত হচ্ছে। দেশের হাওর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সাধারণত বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সম্প্রতি দেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও বজ্রপাত এবং এতে প্রাণহানি আগের চেয়ে বেশি। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের তাপমাত্রা আগে এখনকার মতো ছিল না। ওই সব এলাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে, ফলে বজ্রপাতও বেড়েছে। যেসব জায়গায় বজ্রপাত আগে থেকেই বেশি, সেখানে এখন আরও বেশি হবে। যেসব অঞ্চলে কম ছিল, সেখানে বাড়বে।

এ তাপমাত্রা চলমান থাকলে বছরে ৫০ শতাংশ বেশি বজ্রবৃষ্টি হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এ ছাড়া শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও কুমিল্লায় বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়েছে।

এসএসটিএএফের সেক্রেটারি রাশিম মোল্লা বলেন, বাংলাদেশে মোট বজ্রপাতের ৭০ শতাংশই হয় এপ্রিল, মে ও জুন মাসে। মৌসুমি বায়ু দেশের আকাশে আসার আগের দুই মাস এপ্রিল ও মে মাসে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এর প্রকোপ থাকে বেশি। বর্ষায় তীব্রতা বাড়ে সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামে। শীতে বেশি আক্রান্ত হয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট। এদিকে সমতল অঞ্চলে বজ্রপাতের পাশাপাশি দেশের পাড়াড়ি এলাকাতেও বজ্রপাত বেড়েছে। পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বজ্রপাত কখনোই ভয় পেতেন না। উঁচু পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে দীর্ঘ আকৃতির বৃক্ষরাজি তাদের সুরক্ষা দিয়ে এসেছে সব সময়। তবে সে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখলেই দ্রুত বাড়ি ফেরেন অথবা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন পাহাড়ের বাসিন্দারা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ অঞ্চলটি প্রথমবারের মতো এমন প্রাণঘাতী বজ্রপাতের সম্মুখীন হয়েছে। এটি ঘটেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করে এবং রাস্তার পাশে প্রায় ৫ মিলিয়ন পাম গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি এখনও প্রত্যাশিত ফলাফল দেয়নি কারণ যে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল সেগুলো বড় হতে অনেক সময় নেয়।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, যেসব খোলা মাঠে গাছ কম সেখানে লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের অনুমোদনের জন্য আমরা পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, আগাম সতর্কবার্তা পাঠাতে আটটি বজ্রপ্রবণ জেলায় বজ্রপাত শনাক্তকরণ সেন্সর স্থাপন করেছে। আমরা বজ্রপাত শুরু হওয়ার ৩০ মিনিট আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষকে বার্তা পাঠাই। আমরা একটি পাইলট প্রকল্পও চালাচ্ছি যাতে নির্দিষ্ট এলাকায় উপস্থিত লোকজনকে বার্তা পাঠানো যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান