নিজস্ব প্রতিবেদক:-
ভোট বর্জনের আন্দোলনে সফলতা দেখলেও নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় কিছুটা হতাশ হয়েছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের পদক্ষেপই নিক না কেন, সেটি নির্বাচনের আগে নেওয়া হলে আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতির দিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হতো। কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে কোনো পদক্ষেপ ভবিষ্যতে নেওয়া হলেও সেটিতে কার্যকর ফলাফল পেতে দেরি হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করেন, তাদের আগামী দিনে যা করার তাও যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থানের দিকে নজর রেখেই করতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অথবা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো কোনো বিশেষ দল বা সরকারের সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করে পদক্ষেপ নেয়, এ রকম ধারণা আসলে সঠিক নয়। বৈশ্বিক ও ভূরাজনীতির কৌশলগত দিকগুলো অবশ্যই তাদের বিবেচনায় থাকে।
তিনি বলেন, ‘আসলে বাংলাদেশে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন প্রকৃতি, পশ্চিমাদের মানসিকতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তদুপরি তাদের কার্যপদ্ধতি আমাদের থেকে ভিন্ন। যেমন: সেখানে মাত্র একজনের কথায় নীতিমালা প্রণীত হয় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণসহ ভিন্ন মতেরও সুযোগ থাকে। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে কারও হতাশ হওয়ার বিষয়টি যুক্তিগ্রাহ্য নয়।’
‘তবে এটা ঠিক, যখন কোনো একটি দেশে অগণতান্ত্রিক শক্তি জনগণের ওপর চেপে বসে এবং তারা শাসক শ্রেণির হাতে অত্যাচার-নির্যাতন ভোগ করে, তখন তারা চায়, কেউ না কেউ তাদের উদ্ধার করুক। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা ও গুঞ্জন এ কারণেই।’ যোগ করেন ড. মঈন খান।
নির্বাচনের এক দিন পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নির্বাচন সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক হয়নি বলে বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু বিএনপিসহ ভোট বর্জনের আন্দোলনে থাকা দলগুলো মনে করে, নির্বাচনের পরের এই বিবৃতির এক ধরনের মূল্য থাকলেও সরকার গঠনের পরে এটি বড় ধরনের কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না কিংবা সরকারকে চাপেও ফেলা যাবে না। কারণ ভূরাজনৈতিক তথা বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীত বলয়ে থাকা দেশ রাশিয়া ও চীনসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারতও সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব শেষ পর্যন্ত কত দূর যেতে পারবে, তা নিয়েও এক ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে বিএনপির মধ্যে। নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপটা আগে হলে ভালো হতো। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের রাজনীতিকদের মনস্তত্ত্বই যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারেনি।
বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল খবরের কাগজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নেওয়া না নেওয়া সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা সময় মতো সেটি নেবেও। কিন্তু ভোট বর্জনের আন্দোলনে বিএনপি পুরোপুরি সফল হয়েছে। তিনি বলেন, তথাকথিত নির্বাচন করে সরকার যে অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে তার বড় প্রমাণ হলো তারা নির্বাচন, গেজেট প্রকাশ এমপিদের শপথ এবং মন্ত্রিসভা গঠন সবকিছুতেই তাড়াহুড়ো করছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সম্ভাব্য পদক্ষেপের দিকে নজর রেখে আন্দোলন কর্মসূচির সমন্বয় করার কৌশল নিয়েছিল বিএনপি। দলটি মনে করেছে, এমন কৌশলে সরকারকে দ্রুত চাপে ফেলা যাবে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে কোনো পদক্ষেপ বা স্যাংশন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসেনি। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় বড় ধরনের কোনো সহিংসতাও হয়নি। নির্বাচনের পর যথারীতি সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভাও আজ গঠন করার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ভবিষ্যতে কী রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। নেতা-কর্মীরাও দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সমমনা ও শরিক দলসহ ভোট বর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক শুরু করেছে দলটি। তবে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত কম হওয়ায় বিএনপির ভোট বর্জনের রাজনীতি সফল হয়েছে বলে দলটির নেতাদের পাশাপাশি আন্দোলনে থাকা দলগুলোর নেতারাও মনে করেন।
এলডিপির প্রেসিডেন্ট ড. অলি আহমদ মনে করেন, জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি, এ জন্য আন্দোলন শতভাগ সফল হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলে সেটি সঠিক হতো কি না, বলা যায় না। কারণ তখন অন্যান্য দেশ বা সরকার বলত, সবকিছু সঠিক পথে চলছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাধার কারণে হয়নি। কিন্তু এখন পদক্ষেপ দিলে সেটি বরং কার্যকর বেশি হবে। কারণ সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, বিএনপি কিংবা আন্দোলনে থাকা দলগুলো হতাশ নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পলিসি গ্রহণ করে তাদের বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে।
১২-দলীয় জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে আমেরিকা-ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচনের আগে বা পরে তারা পদক্ষেপ না নেওয়ায় কিছুটা হতাশা আছে নেতা-কর্মীদের মাঝে। আশা করি, তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে জনসম্পৃক্ত নতুন কর্মসূচি নিয়ে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। যুগপৎভাবে সবার সঙ্গে আলোচনার পর নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে।’ নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর এই অবস্থানে বিএনপি কিছু আশাবাদী হয়ে উঠছে বলে দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার সব দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অস্ট্রেলিয়া বলেছে, নির্বাচন যে পরিবেশে হয়েছে, তা দুঃখজনক। নির্বাচনে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল নীতিতে ঘাটতি কানাডাকে হতাশ করেছে বলে গতকাল দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনের পরে ৯ জানুয়ারি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য প্রথমবারের মতো ১২-দলীয় জোট, এলডিপি ও জাতীয়তাবাদী সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল ওই বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পাঁচ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। গতকালও শরিক একাধিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিএনপি।

