একাত্তর বাংলা
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব নির্বাচন। কোনো নির্বাচন এলেই বাংলাদেশের মানুষ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। আর তাই এই মুহূর্তে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজে ভাসছে গোটা দেশ। বিএনপি-জামায়াত জোটের সমস্ত অপচেষ্টাকে রুখে দিয়ে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আওয়ামী লীগসহ ২৭টি দল নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়েছে। সারা দেশে চলছে জমজমাট নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। এবারের নির্বাচনে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বহু আসনেই তারা স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমানে লড়াই চালাচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াত ব্যস্ত তাদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে। তবে নির্বাচনকে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সফল করতে সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে খোলামেলা যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে তাদের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট ভোটে অংশ না নিলেও তার কোনো প্রভাব চোখে পড়ছে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। মহানগর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে নির্বাচনকে ঘিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি অন্যরাও নিজেদের প্রতীক নিয়ে ভোট প্রার্থনায় নেমে পড়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ব্যস্ত দেশে অশান্তি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে। বিভিন্ন জায়গায় তারা জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে মাঠে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন আগেই জানিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সব রকম ব্যবস্থা তারা নেবে। সেই মতো ভোট প্রক্রিয়া শুরু হতেই গোটা দেশের ৬৫২টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসিদের পাশাপাশি ৪৭ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করে নির্বাচনে নিরপেক্ষতার বার্তা দেন তারা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর।
দেশের ৩০০ আসনের জন্য দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৭১৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে মোট ৭৩১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৮৫ জন। আওয়ামী লীগেরই টিকিট বঞ্চিতরা অনেকে স্বতন্ত্র হিসাবে রয়েছেন। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সর্বত্রই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা সকলের নজর কেড়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিন্দুমাত্র বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে না ইসি।
জানা গেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৯টি দেশ থেকে পর্যবেক্ষকরা আসছেন। এই দেশগুলো হলো ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান, উজবেকিস্তান, মরিশাস, জর্জিয়া ও ফিলিস্তিন। এ ছাড়াও ওআইসি, কমনওয়েল্থ ও আরব পার্লামেন্টের তরফেও ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে নজরদারি চালানো হবে।
ঘোষণা এসেছে, নির্বাচনে কোনো রকম অশান্তি বরদাশত করা হবে না। আগামী ৩ জানুয়ারি সেনা বাহিনীকেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হচ্ছে।
এদিকে সরকারও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাই কঠোরভাবে পালিত হচ্ছে নির্বাচনী আচরণবিধি। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মেনে চলছেন নির্বাচনী আচরণবিধি। ভোট প্রক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র খুঁত রাখতে নারাজ সরকার। ভোটকে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করার চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েই কাজ করে চলেছে নির্বাচন কমিশন। সর্বত্র চলছে তাদের কড়া নজরদারি। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় ইসি আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীকে গত বুধবার তলব করে। পরে তাদের উভয়কে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করা হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটারদের মন জয় করতে চলছে প্রচার। নির্বাচনের তফসিল অনুসারে ১৮ ডিসেম্বর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা।
আগামী ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার বাদে অন্যান্য সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই গোটা দেশ এখন ব্যস্ত ভোটের প্রচারে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ২৯টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিপরীতে বিএনপিসহ কয়েকটি দল একদফা দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের নামে অশান্তি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনসমর্থনহীন বিএনপি হতাশার থেকেই নির্বাচন বর্জন করেছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের ধ্বংসাত্মক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৩ ও ১৯ ডিসেম্বর ট্রেনে হামলার পর বিএনপি ও জামায়াত জোট তাদের জনসমর্থন আরও হারিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, ভোটচুরির সুযোগ না থাকাতেই বিএনপি-জামায়াত ভোট বর্জন করেছে। কারণ ভোটচুরি ছাড়া এই জোট কিছুতেই ক্ষমতায় আসতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে চান না। নির্বাচনী জনসভায় তার সাফ কথা, উন্নয়ন ধরে রাখাই হবে আওয়ামী লীগের প্রধান লক্ষ্য। জঙ্গিবাদকে নির্মূল করারও ডাক দেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেন, ‘আমরা যেমন উন্নয়নের কাজ করেছি, ওদের কাজ হচ্ছে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো। আজকে সমস্ত জায়গায় বোমাবাজি, খুন আর অগ্নিসন্ত্রাস। এর বিরুদ্ধে সকলকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
তবে সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত যে সরকার ফেলতে পারবে না সেটাও মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দুইটা আগুন দিলেই সরকার পড়ে যাবে, এত সহজ না। অগ্নিসন্ত্রাস করে বিএনপি-জামাত নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না’। ভোটে শান্তি বজায় রাখতে শেখ হাসিনার অনুরোধ, ‘নির্বাচনে যেমন আমাদের দলের প্রার্থী আছেন, তেমনই স্বতন্ত্র এবং অন্য দলের প্রার্থীরাও আছেন। সবারই ভোট চাওয়ার অধিকার আছে। মানুষ যাকে ইচ্ছা তাঁকে ভোট দেবেন। ভোট নিয়ে যাতে কোনো সংঘাত না হয় সেটা দেখতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় হলে দলের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না’।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আরও সক্রিয়ভাবে প্রচারে নেমে পড়েছেন। সব মিলিয়ে জমে উঠেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন। বিএনপি-জামায়াতের বর্জন তাতে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রেও জয় হবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

