প্রসাদ দাস, বিশেষ প্রতিনিধি : ৩০০ আসনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঘোষণা করায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে শরিক ও মিত্র দলের নেতা কর্মীরা । ক্ষমতাসীনরা আভাস দিয়েছে, আসন্ন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে কেউ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে পারবে না। শরিকদের আশঙ্কা, এ কারণে তাদের ছেড়ে দেওয়া আসনে আওয়ামী লীগ নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন। তাহলে নিজেদের সামর্থ্যে ভোটে জেতা সম্ভব হবে না।
রোববার ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা-৮ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। গত তিনবার ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থী হয়ে এখান থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেছেন, ‘এ নিয়ে আলোচনা হবে।’ সমঝোতা হবে কিনা– প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
কুষ্টিয়া-২ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ বাদে ২৯৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২ এবং জাতীয় পার্টির (জাপা) সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য। এই দুটি আসন গত তিন নির্বাচনে শরিক ও মিত্রদের ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। এদিকে ময়মনসিংহ -৪ আসনের এমপি দু’বারের টানা সংসদের বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারেন এই আশনে এমন গুঞ্জন রয়েছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিএনপিবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনে ৫৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিল না। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ সংসদ নির্বাচনে শরিক ও মিত্রদের ৩৯ আসন ছেড়েছিল ক্ষমতাসীনরা। রোববার গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কেউ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারবে না। প্রতি আসনে একাধিক ‘ছায়া প্রার্থী’ দেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
প্রকাশ্য জোট না হলেও গত দুই নির্বাচনে জাপার সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছিল আওয়ামী লীগ। দশম সংসদ নির্বাচনে ৪২ এবং পরের নির্বাচনে ২৬ আসন ছেড়েছিল। এসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিল না। এবার আওয়ামী লীগের মতো জাপাও ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দশম জাতীয় নির্বাচনে ৮৮ আসনে এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৬৩ আসনে লাঙ্গলের প্রার্থী ছিল। ফের প্রধান বিরোধী দল হতে পারার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ধোঁয়াশা তৈরি করেছিল। আশ্বাস পেয়ে গত বুধবার ভোটে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। দলটির সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ দেখাতে আগের দু’বারের মতো এবারও ছাড় পাওয়া আসনের বাইরেও জাপার প্রার্থী থাকবে। তবে দলটি চায়, তাদের যেসব আসন ছাড়া হবে, সেখানে নৌকার প্রার্থী থাকবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থীও হবেন না আওয়ামী লীগ নেতারা।
আওয়ামী লীগের ছায়া প্রার্থী কৌশলের বিষয়ে আশঙ্কা করে ঢাকার এক জাপা এমপি সমকালকে বলেছেন, ‘নৌকার প্রার্থী না থাকুক, আওয়ামী লীগের কেউ ভোটে থাকলে অন্য দলের কেউ টিকতেই পারবে না। সব কেটে নিয়ে যাবে। এভাবে নির্বাচন হলে লাভ নেই।’
নীলফামারী-৩ আসনে জাপার এমপি মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল বলেছেন, এখনও জানি না আমার আসনে নৌকার প্রার্থী থাকবে কিনা। এ বিষয়ে দলের কাছ থেকে নির্দেশনা পাইনি।
তরীকত ফেডারেশনের চেয়াম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর চট্টগ্রাম-২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গত দুবার এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়া মাইজভাণ্ডারী এতে চিন্তিত নন। তিনি বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও সব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর প্রতীক বরাদ্দের সময় শরিকদের আসন ছেড়ে দেয়। এবারও তাই হতে পারে। তরীকত ১৪ দলের শরিক। শেখ হাসিনা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, ১৪ দলেরও নেত্রী। তিনি চাইলে, তরীকত নির্বাচন করবে। তরীকত ১৩টি আসন চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যা দেবেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকব।
নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সব আসনে প্রার্থী দিলেও সমস্যা নেই। দলটি চাইলে প্রার্থীরা সরে যাবেন। সরে না গেলেও সমস্যা হবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ সভাপতি যদি ওই প্রার্থীদের জন্য প্রতীক বরাদ্দের চিঠি না দেন, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ তা করবে কিনা, নিশ্চিত হতে না পারায় শঙ্কায় রয়েছে শরিকরা।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে কিছুটা ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘জোটের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। জোট হয় জোটের বিপরীতে। জোটের প্রয়োজন না পড়লে কেন জোট করতে যাব?’
আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, সমঝোতা হলে প্রার্থী প্রত্যাহার করা হবে। ১৪ দল ও মহাজোট শরিকসহ নতুন করে যোগ হওয়া নির্বাচনী মিত্রদের ২৫-৩০টি আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। বিরোধীদলীয় জাপাকে ছাড়া হতে পারে ৩০-৩৫ আসন।