নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিশুদের বুনিয়াদি শিক্ষা। তবে স্থানীয় এলাকার কিছু নেতিবাচক নাম দিয়ে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ হওয়ার কারণে শিশু অবস্থায় বা পরবর্তী সময় তারা নানারকম ট্রলের শিকার হয়। অনেক সচেতন অভিভাবক এমন নামের বিদ্যালয়গুলোতে তাদের সন্তানদের পড়াতেও চান না। অনেক শিশু লজ্জা পেয়ে এসব বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সচেতনমহলের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল শ্রুতিকটু শোনায় এমন বিদ্যালয়গুলোর নাম পরিবর্তন করার। অবশেষে এমন একটি দায়িত্বশীল যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শ্রুতিকটু ও নেতিবাচক অর্থ দাঁড়ায় এ ধরনের ২৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করেছে তারা।
গতকাল বুধবার ২৪৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ কবির উদ্দীন।
প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, শ্রুতিকটু নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও সিরাজগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এছাড়াও রাজশাহী, বগুড়া, চট্টগ্রাম, জামালপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বাগেরহাট, যশোর, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, সিলেট ও হবিগঞ্জ এলাকায় এ ধরনের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর নাম পাল্টানো হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে নাটোরের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে ধরা যায়। নাটোর সদরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বলদখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এলাকার নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ। কিন্তু, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শিখতে আসে মাথা উঁচু করে চলার জন্য। বাংলায় বলদ শব্দটা ব্যবহৃত হয় মূর্খ অর্থে। তাই বলদ শব্দযুক্ত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আসলে থাকা উচিত নয় যা ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভবিষতে ট্রলের শিকার করতে পারে। তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যালয়টির নাম বদলে দেওয়া হয়েছে স্বপ্নসিঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। রুচিশীল এই নামটি ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্নের সিঁড়ি হবে এমনটাই প্রত্যাশা নাম বদলের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞ কমিটির।
একইভাবে খুলনার কয়রার খাসিটানা উচ্চবিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে উদয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা পাটাচোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে ছায়াবীথি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাটোরের লালপুর উপজেলার গোদাগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে সালামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার চোরমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে মাতৃছায়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একই উপজেলার চুলধরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ফুলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার ভন্ডগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বর্ণমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এখাবে শ্রুতিকটু ও নেতিবাচক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
একইভাবে কুড়িগ্রামের রৌমারীর ঝগড়াচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম বদলে করা হয়েছে আনন্দধারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মাথাফাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম বদল করে রাখা হয়েছে মাধবীলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একই উপজেলার বোদা ময়নাগুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম বদল করে রাখা হয়েছে দোলনচাঁপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
গত বছরের ১৯ জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ ও বিদ্যমান নাম পরিবর্তন নীতিমালা-২০২৩ জারি করে মন্ত্রণালয়।
ওই সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব ফরিদ আহাম্মদ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনেকগুলোর নাম শ্রুতিকটু ও নেতিবাচক ভাবার্থ সংবলিত। যা শিশুর রুচি, মনন, বোধ ও পরিশীলিতভাবে বেড়ে ওঠার অন্তরায়। এ জন্য মন্ত্রণালয় এসব বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে সুন্দর, রুচিশীল, শ্রুতিমধুর এবং স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী এ রকম নেতিবাচক ভাবার্থ সংবলিত নাম পরিবর্তন করা হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬ টি। এগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯১। শিক্ষক আছেন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৯ জন।

