নিজস্ব প্রতিবেদক
মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনার পর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে; কিন্তু আবারও ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্র সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে বলে দাবি করে এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে বুয়েটের সর্বস্তরের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই প্রতিবাদের সূত্রপাত পরে সব শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আন্দোলন শুরু করে। এ সময় নতুন করে ছাত্র রাজনীতি শুরুর চেষ্টাকারী এক ছাত্রনেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের পদত্যাগসহ ৬ দফা দাবিতে বিক্ষোভ করে তারা। ইফতারের পর রাত পর্যন্ত চলে এ বিক্ষোভ।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আবরার ফাহাদ হত্যার পর বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পরও রাতে ক্ষমতাসীন দলের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালায়। আবরার হত্যার দায়ে এই সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী আদালতেও অপরাধী প্রমাণিত হয়েছে। ফলে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি চালু হলে আবারও হামলা-নির্যাতনের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
নেতা-কর্মীদের বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শুক্রবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে একদল শিক্ষার্থী।
তাদের অভিযোগ, বহিরাগত ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগ নেতারা প্রায়ই বুয়েট ক্যাম্পাসে আসেন এবং রাতে ক্যাফেটোরিয়ার সামনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালান। এদিকে, শহীদ মিনারে প্রতিবাদের খবরে অন্য শিক্ষার্থীরাও কেন্দ্রীয় ক্যাফেটোরিয়ায় এসে জড়ো হন এবং সবাই মিলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে শহীদ মিনারে থাকা শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে জানান, ‘আমাদের দাবি পূরণ না হলে আমরা সব ধরনের পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জন করব, এই ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি আমরা আর চাই না।
এরপর বুয়েট শিক্ষার্থীরা ওই অবস্থান কর্মসূচি থেকে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি আদায়ে আগামীকাল শনিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত বুয়েট প্রশাসনকে সময় বেঁধে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
দাবিগুলোর মধ্যে, ছাত্রলীগ নেতাদের রাতে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশে সহায়তাকারী শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দিচ্ছে তার ব্যাখ্যা চান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ সময় ব্যর্থতার দায়ে বুয়েট ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ইফতারের পরেও অব্যাহত থাকে। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এসব দাবিতে স্লোগান দেন। তারা বলেন, ডিএসডব্লিউকে না জানিয়ে বা তার অজান্তে কোনোভাবেই ছাত্র সংগঠনের নেতারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারে না। এর দায়ভার তাকেই নিতে হবে। আমরা চাই তিনি পদত্যাগ করুন।
শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবি হচ্ছে ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্পষ্ট বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে ২৮ মার্চ মধ্যরাতে রাজনৈতিক সমাগমের মূল সংগঠক ২১তম ব্যাচের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ রাব্বিকে বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও হলে সিট বাতিল করতে হবে। ২. ইমতিয়াজের সঙ্গে বুয়েটের বাকি যেসব শিক্ষার্থী জড়িত ছিল, তাদের বিভিন্ন মেয়াদে হল ও টার্ম বহিষ্কার করতে হবে। ৩. রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বহিরাগত যারা ক্যাম্পাসে ঢুকেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তারা কেন ও কীভাবে প্রবেশের অনুমতি পেল- এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট জবাবদিহি বুয়েট প্রশাসনকে দিতে হবে। ৪. ১ ও ২ নম্বর দাবি আগামীকাল শনিবার সকাল ৯টার মধ্যে বাস্তবায়ন করা না হলে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের (ডিএসডব্লিউ) পদত্যাগ চাই। ৫. ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে বহিরাগতদের প্রবেশের কারণে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এর প্রতিবাদ হিসেবে শনি ও রোববার টার্ম ফাইনালসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করা হবে। ৬. আন্দোলনরত বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, এ মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

