বাংলার বিরোধিতা করা জিন্নাহ নিজেই জানতেন না উর্দু!

Date:

একাত্তর বাংলাঃ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এসে পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার সেই বক্তব্য সেদিন যে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করেছিলো, তাতেই জ্বলে উঠেছিলো ভাষা আন্দোলনের বারুদ। বাঙালিদের কাছে সেদিন জিন্নাহ চিত্রিত হয়েছিলেন এক বাংলা-বিদ্বেষী গণশত্রু হিসেবে, যার উদ্দেশ্যই ছিলো বাঙালিদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিনাশ ঘটানো।

এই ঘটনা থেকে কেউ যদি মনে করেন জিন্নাহ ছিলেন উর্দুর গুণগ্রাহী এবং উর্দুই ছিলো তার জীবনের একমাত্র প্রেম- তাহলে বড় এক ভুলই হবে। জিন্নাহর জীবনী যারা পড়েছেন, এবং ইতিহাস সম্পর্কে যাদের কিছুমাত্র জ্ঞান আছে, তারা জানেন, উর্দু পড়তে বা লিখতে পারা তো দূরে থাক, কায়েদে আজম উর্দু বলতেই পারতেন না! কারণ পাকিস্তানের এই প্রতিষ্ঠাতার মাতৃভাষা ছিলো ভারতের অন্যতম ভাষা- গুজরাটি!

প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ আকবর সালাউদ্দিন আহমেদ তার ‘জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটি’তে উল্লেখ করেন, জিন্নাহর বাবা জিন্নাভাই পুঞ্জা এবং মা মিঠিবাই ছিলেন গুজরাট প্রদেশের কাথিয়াওয়ারের পানেলি গ্রামের অধিবাসী। জিন্নাহ’র পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ধনাঢ্য শিয়া মুসলিম ব্যবসায়ী। আনুমানিক ১৮৭৫-এ তারা চলে আসেন করাচিতে। সেখানেই বছরখানেক পর জন্ম নেন জিন্নাহ।

সুয়েজ খালের কল্যাণে বম্বের চেয়ে করাচি দিয়ে ইওরোপে বাণিজ্যের পথ সুগম হওয়ায়, সেখানে তখন ব্যবসায়িদের চলছে দারুণ সুদিন। জিন্নাহ পরিবারও তাই স্বচ্ছলভাবেই কাটাচ্ছিলো দিন। গুজরাত ছেড়ে এলেও দেশী সংস্কৃতি ভুলতে পারেননি জিন্নাভাই-মিঠিবাই দম্পতি। তাই সাত ছেলেমেয়ের সবাইকেই মাতৃভাষা গুজরাটিতেই লিখতে, বলতে ও পড়তে শিখিয়েছিলেন তারা। গুজরাটি ছাড়াও কুচি এবং ইংরেজি ভাষা শিখেছিলো তারা। তবে উর্দু কখনোই নয়।

জিন্নাহ পরিবারের ছোট মেয়ে ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ফাতিমা জিন্নাহ তার ভাইকে নিয়ে লেখা বই, ‘মাই ব্রাদার’-এ লিখেছেন তার ভাই উর্দু কিংবা বাংলায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। পাকিস্তানের সুশীল সমাজের সঙ্গে তার বাতচিত হতো ইংরেজিতে।

জিন্নাহর জীবনী লেখক হেক্টর বোলিথো লিখেছেন, প্রথম জীবনে তিনি নিজের নাম সই করতেন গুজরাতি ভাষারীতি অনুসারে।

উর্দু যদি নাই পারেন, তবে এই ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে উঠে-পড়ে লেগেছিলেন কেন জিন্নাহ? এর পেছনের কারণটা ঘোরতর রাজনৈতিক।

উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয় দেশভাগের পরপরই। ১৯৪৭ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই সমাবেশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবল দাবি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয়তালিকা থেকে বাদ দেয় ও মুদ্রা এবং ডাকটিকেট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান এবং সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ইংরেজিতে দেয়া ওই বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ একে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবি তোলেন।

১৯ মার্চ ১৯৪৮-এ ঢাকায় এসে পৌঁছান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ভারত বিভাগের পর এটাই ছিল তার প্রথম পূর্ব পাকিস্তান সফর। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) এক গণ-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ও সেখানে তিনি ভাষণ দেন। তার ভাষণে তিনি ভাষা আন্দোলনকে পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।

সেখানেই তিনি ‘উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা’- এই বক্তব্য দেন।

কিন্তু সেসময় গোটা পাকিস্তানের কেবল আট শতাংশ জনগণের ভাষা ছিলো উর্দু। বাকিরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতো। সবচেয়ে বড় কথা, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিলো বাংলা। তাহলে অন্য সকল ভাষা, বিশেষ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিনে না চাওয়ার কারণ কী?

সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ তার ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ে লিখেন, ‘উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ ‘নিরক্ষর’ এবং সকল সরকারি পদের ক্ষেত্রেই ‘অনুপযুক্ত’ হয়ে পড়বে।’

অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ক্রমান্বয়ে হুমকি হয়ে দাঁড়ানো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রশাসন থেকে ছেঁটে ফেলার একটা অপচেষ্টাই ছিলো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অন্যতম উদ্দেশ্য; অন্ততঃ তখনকার বুদ্ধিজীবীরা তাই মনে করেছিলেন।

এই যুক্তির সঙ্গে আরও একটি বিষয় যোগ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। তার মতে এখানে ধর্মকে কাজে লাগিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।

সময় নিউজকে তিনি বলেন, ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পেছনে জিন্নাহর কী কী বিবেচনা কাজ করেছিলো, সেটা নিয়ে উনি সুস্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। তখন তো ৫৬ শতাংশ মানুষ পূর্ববাংলায়। আর পূর্ব বাংলার কিছু পরিবার ছাড়া বাদবাকি কেউ তো উর্দুভাষী ছিলো না। সেখানে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে বাঙালির জন্য তো একটা বড় বিপদঘণ্টাই ছিলো। সেটাও নিশ্চয়ই একটা কারণ।’

তার মতে উর্দুর এই বিষয়টি বাঙালি ছাড়া পাকিস্তানের অন্য ভাষাভাষীদের জন্যও প্রযোজ্য ছিলো। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে তা পাঞ্জাবিকেও শিখতে হতো, সিন্ধি বা পখতুনকেও শিখতে হতো। তবে বাঙালিদের জন্যই এটি ছিলো সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ।

মেসবাহ কামাল আরও বলেন, ‘উর্দুকে বেছে নেয়ার পেছনে আরও একটা কারণ হতে পারে যেটা, সেটা হলো, তখন তো ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িকতা দিয়েই সবকিছুকে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। এটা ছিলো সস্তা ধর্মীয় উন্মাদনাকে ব্যাবহার করার চেষ্টা। আসলে উর্দু হরফের সঙ্গে আরবি হরফের কিছুটা মিল আছে। খুব সামান্য সংখ্যক আলেম-ওলামা ছাড়া, আরবি তো সরাসরি প্রচলন করা যেত না, কারণ পাকিস্তানে আরবি ভাষায় পঠন-পাঠন বা কথা বলতে তখন কেই বা পারতো? সাধারণ মানুষের মধ্যে কোথাও তো আসলে আরবি ভাষার প্রচলন ছিলো না। কাজেই বাঙালি মুসলমানের ভাষা আরবি- এরকম কথা বলার চেষ্টা চলছিলো তখন। আরবি বর্ণমালায় বাংলা লেখার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো সবই হয়েছে, কিন্তু সেসব ধোপে টেকেনি। তখন উর্দুটা আরবির কাছাকাছি হওয়ায়, দেখতে যেহেতু অনেকটা মিল আছে- সেটাকে ব্যবহার করে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে এক্সপ্লয়েটেশন করার উদ্দেশ্যে আমার কাছে মনে হয় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলো তারা।’

ধর্মকে ভিত্তি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের তৈরি হওয়াটাকেই ‘বড় অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। তখন থেকেই রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য ধর্মকে হাতিয়ার করাটাই ছিলো জিন্নাহ্’র কৌশল। তারই একটা সম্প্রসারণ ছিলো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা- এমনটাই মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

জিন্নাহর সেই কৌশল সফল হয়নি। উর্দুকে হটিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করে নিয়েছে বাঙালি নিজের রক্ত দিয়ে। আর তাই কেবল সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রতীক হিসেবেই নয় একুশে ফেব্রুয়ারি এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী মানুষের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রতীক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান