ড. শফিকুল ইসলাম
করোনা ভাইরাসে শিক্ষা, পর্যটন খাত ও সব ধরনের ব্যবসায়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ছিল। অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন তখন। অনেকেই আবার নানাভাবে মোকাবিলা করেছেন। তা তখনকার বাস্তবতায় যৌক্তিক ছিল। করোনার আগে প্রায় কয়েক দশক ধরে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬ বিলিয়নে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু করোনায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি করে গেল। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচির দিয়ে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আবার কালো মেঘ নিয়ে আসছে। এ কারণে ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শীতকালীন পোশাকের ব্যবসায়ীরা এখন হুমকির মুখে।
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় খারাপ সময় পার করছেন শীতের পোশাকের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। মৌসুমের এ সময়ে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে কেনাবেচা নেই বললেই চলে। এতে লাভের পরিবর্তে ক্ষতিতে তাদের মাথায় হাত পড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ আর শীতের নতুন পোশাক কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ জন্য পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ীদের কপালেও দুশ্চিন্তার ভাঁজ। লাগাতার রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শীতকালীন ব্যবসায় বড় লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। একদিনে গড়ে মোট ক্রেতা আসতেন ৫০ জন। কিন্তু এখন দেখা যায়, ৫ জনও আসেন না।
হরতালের কারণে পরিবহনব্যবস্থায় ব্যাপক সংকট রয়েছে। রাস্তায় সব পরিবহন চলছে না। কারণ একেকটি গাড়ির দাম অনেক। তাই মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থায় ক্রেতারা ঝুঁকি নিয়ে লোকাল বাসে শপিং বা শীতকালীন পোশাক কিনতে যাচ্ছেন না। কেননা রয়েছে জীবন হারানোর হুমকি। ফলে এ ধরনের হরতাল বা অবরোধ কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং যারা এসব হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচি দিচ্ছেন, তাদের জনসমর্থন কমে যাচ্ছে। তাদের বলব, যৌক্তিকভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জনসমর্থন আদায় করার উদ্যোগ নিন। সংবিধান মেনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন। এভাবে সরকারকে ফেলে দেওয়া যাবে না। সরকারকে ফেলতে হলে জনসমর্থন লাগবে। এ জন্য বিরোধী দলগুলোকে এমন কাজ করতে হবে যেখানে সাধারণ জনগণ অংশগ্রহণ করে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী বিএনপির মহাসমাবেশ-পরবর্তী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে গত ২৮ অক্টোবর থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ২৫ দিনে ৩১০ স্থানে ভাঙচুর ও ৩৭৬ জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। দেশব্যাপী অবরোধ-হরতালে গত ২৯ অক্টোবর থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ২৭৫টি যানবাহন, ২৪টি স্থাপনা ও ১১টি অন্যান্যসহ মোট ৩১০টি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ২৯০টি যানবাহন, ১৭টি স্থাপনা ও ৬৯টি অন্যান্যসহ মোট ৩৭৬টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে পোশাক খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কারণ পোশাক ও পোশাকের কাঁচামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়া হচ্ছে।
শীতের মৌসুম সামনে রেখে এই সময় গরম পোশাক ও কম্বলের পাইকারি বাজার জমজমাট হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীরা অনেক বড় অঙ্কের লাভের জন্য এ সময়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু অবরোধ সব শেষ করে দিচ্ছে। এ জন্য বিপুল বিনিয়োগ ও আগাম প্রস্তুতিও থাকে তাদের। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শীত মৌসুমের ব্যবসা পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে কয়েক ধাপে অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। কিন্তু ওই আন্দোলনে কোনো মানুষ তাদের পক্ষে রাস্তায় নামছে না। কী করছেন, অনলাইনে কর্মসূচি দিচ্ছেন। এসব করে আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। আমরা সাধারণ নাগরিক নিরাপদে রাস্তায় চলাফেরা করতে চাই, ব্যবসায়ীরা নির্বিঘেœ তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান। এসব কর্মসূচি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে শীতের পোশাক ব্যবসায়ীদের। রাজনৈতিক দলগুলোর এসব কর্মসূচির কারণে শীতকালীন যে নতুন পোশাক পরার সংস্কৃতি, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে হরতাল-অবরোধের প্রভাব বেশি। রাজধানীতে শীতের গরম কাপড়ের দোকানে অন্য বছর এমন সময় দৈনিক দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে ৫০ হাজার টাকার বিক্রিও নেই। হরতাল-অবরোধের কারণে মফস্বলের মার্কেট ব্যবসায়ীরা ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের কাছে যেতে পারছেন না। কুরিয়ারের মাধ্যমেও সেভাবে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। কুরিয়ারে পাঠানো তো নিরাপদ নয়। এখন সপ্তাহে শুধু শুক্র বা শনিবার যা একটু বিক্রি হয়। তাও লাখ টাকা হয় না প্রতিদিন। এভাবে চললে মহাবিপদে পড়তে হবে। তাই বিভাগীয় শহরসহ সব জেলা শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি।
রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। ক্লাস অনলাইনে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য তো অনলাইনে সম্ভব নয়। তাই কীভাবে নিরাপত্তা বাড়িয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাজ স্বাভাবিক রাখা যায়, এ উপায় বের করতে হবে।
গত কয়েক বছর রাজনীতি স্থিতিশীল ছিল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এমন সময় ফের ২০১৪ সালের মতো সহিংসতা শুরু হলো। এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষাসহ পোশাক খাতও। করোনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল। সরকারের সঠিক নির্দেশনায় আমরা তা কাটিয়ে উঠছিলাম। তবে এখন মানুষসৃষ্ট দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করব এবং এই বিশাল ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেবে দেশ বা জাতি, তা ভেবে শেষ করতে পারছি না। তাই পোশাক খাত রক্ষায় হরতাল ও অবরোধ প্রত্যাহার করুন। একই সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন যাতে কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, এ জন্য সরকারকে আরও সজাগ এবং নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
দেশের বস্ত্রশিল্প ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০০ সুতার মিল রয়েছে। কিন্তু এসব মিলে সুতার উৎপাদন খরচ বেশি। তাই চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হয়। হরতাল বা অবরোধের প্রভাবে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং ঝুঁকিতে আছে গার্মেন্টশিল্প। কাঁচামালের আমদানি কম ও খরচ বেশি হওয়ায় এবার দামও বাড়তি। দেশি কম্বলে ৫০ ও বিদেশি কম্বলে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তি রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্রেতারা কম করে কিনছেন। দামে ছাড় দিয়েও বিক্রি বাড়ছে না। ফলে এই হরতাল ও অবরোধের অবসান হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী শীতের মৌসুমে সারাদেশে ৮ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার গরম কাপড়ের বাণিজ্য রয়েছে। করোনা মহামারীতে এ বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। আবার বঙ্গবাজার এলাকার অগ্নিকা-ে ওই এলাকার বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লেগেছে। এখন হরতাল-অবরোধে কঠিন সময় পার করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। খুচরা বিক্রেতারাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কারণ অবরোধের দিন তারাও দোকান খুলতে পারছেন না; এমনকি ফুটপাত ব্যবসায়ীরা যারা অল্প আয়ে চলেন, ঝুঁকি এড়াতে তাদেরও ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়। তাই শিক্ষা, ব্যবসা ও অর্থনীতির কথা চিন্তা করে হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা উচিত।
দেশকে অস্থিতিশীল না করে নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনে আসুন। বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দলগুলোকে বলব, কারও নির্দেশে দেশ ধ্বংসের কর্মসূচি না দিয়ে জনগণ ও দেশের কথা ভাবুন। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। যারা হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দিয়ে যানবাহন পুড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করছে, সরকারকে বলব তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
ড. শফিকুল ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

