আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনি মারা গেছেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার আর্কটিক সার্কেলের উত্তরে একটি কারাগারে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার পর তিনি মারা যান। রাশিয়ার কারা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রায় এক দশক আগে আলোচনায় আসেন নাভালনি। তাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে কট্টরবিরোধী নেতা হিসেবে মনে করা হয়। পুতিন ও ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি আন্দোলন করে আসছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর।
ইয়ামালো-নেনেটস জেলার কারা কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইকে-৩ কারাগারে হাঁটাহাঁটি করার পর অসুস্থবোধ করছিলেন নাভালনি। কারাগারটি মস্কো থেকে ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। এতে আরও বলা হয়েছে, অসুস্থবোধ করার পরপরই নাভালনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুতই উপস্থিত হন এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সও ডাকা হয়।
স্থানীয় কারা কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি। অ্যাম্বুলেন্সের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নাভালনির মৃত্যুর বিষয়টি পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে।
২০২১ সালে জার্মানি থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফেরার পর প্রশংসা অর্জন করেন নাভালনি। জার্মানিতে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পশ্চিমা গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাকে নার্ভ এজেন্ট দিয়ে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল।
ওই সময় নাভালনি বলেছিলেন, ২০২০ সালের আগস্টে সাইবেরিয়ায় তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবে তাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল ক্রেমলিন। সেসময় রুশ কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তাকে নার্ভ এজেন্ট দিয়ে বিষ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ নেই।
নাভালনির বিষয়ে আরও যা জানা যাচ্ছে
রুশ রাজনীতিবিদ আলেক্সি নাভালনির মৃত্যু জন্ম দিয়েছে কৌতূহলের। ১৯ বছর কারাদণ্ড পেয়ে আর্কটিক কারাগারে বন্দি থাকার সময় মারা যান তিনি। কী হয়েছিল তার সঙ্গে? রাশিয়ার ফেডারেল পেনটেনশিয়ারি সার্ভিস বলেছে, নাভালনি হাঁটতে বের হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তার খারাপ লাগছে বলে জানান। এর মধ্যেই আচমকা অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। চিকিৎসাকর্মীরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন। এমনকি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সও ডাকা হয়েছিল।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ইতিবাচক কিছু করা সম্ভব হয়নি। প্যারামেডিকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। তার মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে।’
তবে জেলে যাওয়ার আগে থেকেই লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন নাভালনি। ২০২১ সালে তার ওপর বিষ প্রয়োগও করা হয়েছিল। প্রতিবাদে রাশিয়ার সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, নাভালনির ওপর বিষ প্রয়োগের ঘটনায় রুশ সরকারের আঁতাত ছিল।
নাভালনির পক্ষের লোকেরা বলেছে, তাদের মৃত্যুর বিষয়ে জানানো হয়নি। তবে একজন আইনজীবী আর্কটিক অঞ্চলের দূরবর্তী খার্প কারাগারে ঘটনা সম্পর্কে জানার জন্য যাচ্ছেন। পশ্চিমা সরকারগুলো অবশ্য ক্রেমলিনকে দোষারোপ করেছে।
নাভালনি ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে রাশিয়ার কারাগারে ছিলেন। ‘চরমপন্থার’ অভিযোগে তাকে জেল কলোনিতে সাজা দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের আগস্টে সেই মেয়াদ বাড়িয়ে ১৯ বছর করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল। তিনি মস্কো থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পূর্বে ভ্লাদিমির অঞ্চলের জেলে আটকের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন।
ডিসেম্বরে তিনি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন। সেই মাসের শেষে জানা গেল যে, তাকে আর্কটিকের খার্পের কুখ্যাত আইকে-৩ কলোনিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। নাভালনি ২৬ ডিসেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছিলেন, আর্কটিক সার্কেলের অভ্যন্তরে প্রত্যন্ত কারাগারে ২০ দিন থাকার পর এখান থেকে তাকে সরানো হয়। তখন তিনি ভালো ছিলেন।
আইকে-৩ মস্কোর প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। কারাগারটির নামের মানে ‘নর্দার্ন লাইটস’। তবে এটিকে ‘পোলার উলফ’ নামেও ডাকা হয়। কারাগারটি ষাটের দশকে একটি শিবিরের জায়গায় নির্মিত হয়েছিল। স্তালিনের আমলে এটি ছিল শ্রম শিবির নেটওয়ার্কের অংশ যা গুলাগ নামে পরিচিত। এখানে একসঙ্গে ১ হাজার ২০ জন বন্দি থাকতে পারে। বন্দিদের রেনডিয়ারের চামড়ার চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হয়।
২০০৭ সালে দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা দিয়ে নাভালনির উত্থান শুরু হয়। ২০১১-১২ সালে রাশিয়ায় বিশাল বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন তিনি। তবে ২০১৩ সালে অর্থ আত্মসাতের মামলায় প্রথম দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে। তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি তাকে। ২০২০ সালের আগস্টে সাইবেরিয়ায় একটি ফ্লাইটের সময় জ্ঞান হারান তিনি। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর তাকে বার্লিনের একটি হাসপাতালে সরানো হয়।
বার্লিনের হাসপাতালে পরীক্ষায় দেখা গেছে তাকে সোভিয়েত-যুগের নার্ভ এজেন্ট নোভিচক দিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। নাভালনি বিষ প্রয়োগের জন্য পুতিনকে দায়ী করেছেন। ক্রেমলিন এই দাবি অস্বীকার করেছে।

