একাত্তর বাংলাঃ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ১১ তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে বিনা দোষে গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এদিকে সেই শিক্ষার্থী কারাগার থেকে এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন কি ঘটেছিলো তার সঙ্গে……
“ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শিক্ষার্থী এহসান হাবিব সুমন এর চিঠি”

গত ১৯-০২-২০১৯ তারিখে আমি সন্ধ্যাবেলায় (আনুমানিক ৭:৩০-৮:৩০ এর মধ্যে) ক্যাম্পাসের সামনে থেকে গ্রেফতার হই। সেদিনের ঘটনাটা একটু বর্ণনা করতে চাই। আমার একটি বাইক আছে। আমার বাসার নিচে কোনো গ্যারেজ না থাকার কারণে বিগত ৪ মাস ধরে আমি আমার বাইক ক্যাম্পাসের বিবিএ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে রেখে আসছি।
গত ১৯ তারিখেও রাতে (৭:৩০-৮:৩০ এর দিকে) আমি বাইক রাখতে ক্যাম্পাসে গিয়েছি। আমি ভার্সিটি গেট দিয়ে ঢুকে বাইক নিয়ে সোজা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাই। ২-৩ মিনিটের মধ্যে বাইকটা রেখে লক করে হেলমেটটা হাতে নিয়ে বাইরে চলে আসি।
আন্ডারগ্রাউন্ডের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তার প্রমাণ। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে গেটে আসতেই দেখি আমার ডিপার্টমেন্টের ফ্রেন্ড এবং সেই সাথে আমার রুমমেট জিএম শোভন শিশির ক্যাম্পাসের গেটে একটি বেঞ্চে বসা। ও আমার রুমমেট হওয়ায় আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম, “বন্ধু বাসায় যাবি না?” ও বললো,হ্যাঁ,চল একটা চা খেয়ে যাই। ভার্সিটি গেটের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলে এটারও প্রমাণ মিলবে।
এর মধ্যে খুব সম্ভবত আমাদের সহকারী প্রক্টর স্যার ক্যাম্পাস থেকে বের হচ্ছিলেন। উনি আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন আপনার কারা?
এখানে কি করছেন? উনার কথার জবাব দেবার আগেই ২০-৩০ জন পুলিশ হঠাৎ করে গেটের সামনে চলে আসে। অবশ্য কয়েকজন পুলিশ আগে থেকেই ছিল,সবসময়ই থাকে।
এমন সময় পুলিশের এক কর্মকর্তা আমাদের জিজ্ঞাসা করেন আমরা এখানে কি করছি? আমি জবাব দেবার আগেই উনি আমাদের ধরে নেবার আদেশ দেন। মাত্র ২-৩ মিনিটেই সবকিছু ছবির মত কেটে গেল। কিছুই বুঝতে পারলাম না কি হচ্ছে।
কেন তুলে নিচ্ছেন জিজ্ঞাসা করলে কোনো জবাবও পেলাম না। থানায় নিয়ে হাজতে ঢোকানোর পর জানতে পারলাম গত ১৮ তারিখের মারামারিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলতে লাগলো আমরা বিজয় মিছিল করেছি, পোস্টার ছিঁড়েছি কমিটি বাতিল হবার পর, তাই আমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই সমস্ত ঘটনা শুনে আমি অবাক হলাম, যেহেতু আমি জীবনে কখনো পলিটিক্সও করিনি তাই কখনো পলিটিকাল খোঁজখবর নিয়ে মাথাও ঘামাইনি।
আমি চিল্লাই চিল্লাই সবাইকে বলতে লাগলাম,ভাই আমি তো এসবের কিছুই জানিনা। আমি তো কোনোদিন পলিটিক্সও করিনি,আপনার ভুল করে আমাকে ধরেছেন,আমাকে ছেড়ে দিন।
পুলিশ আশ্বাস দিল আপনি নির্দোষ হলে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে,কোন অসুবিধা নেই। রাতে ওসি মওদুদ ভাইয়ের রুমে ডেকে নিয়ে উনি নাম,ঠিকানা সবকিছু জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন ক্যাম্পাসে কেন এসেছিলাম? আমি হেসে হেসেই জবাব দিলাম। বললাম বাইক রাখতে এসেছিলাম, খুবই সুন্দর ব্যবহার করলেন আমার সাথে। আমি কথা শেষ করে বললাম, ভাই আজ কি আমার এখানে থাকা লাগবে? উনি বললেন, বলা যাচ্ছে না। তোমাদের ভেরিফাই করা হবে। তারপর একটু সময় তো লাগবেই।
আমি যেহেতু নির্দোষ ছিলাম সেহেতু ভেরিফাই এর কথা শুনে সাহস পেলাম,কারণ আবারও বলছি আমার কোনোদিনও কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। আর এসব ঘটনার কিছুই আমি জানি না। জড়িত থাকার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। রাত পেরিয়ে সকাল হলো, রাতে অবশ্য আরো ২ জনকে বাসা থেকে ধরে আনা হলো। ও হ্যাঁ একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি, ক্যাম্পাসের গেট থেকে আমি সহ মোট ৫ জন গ্রেফতার হয়েছিলাম। রাতে আরও ২ আসলো। মোট ৭ জন। ভার্সিটি গেট থেকে ধরে আনা ৫ জনের মধ্যে ২ জ বাদে বাকি ৩ জন এবং রাতে ধরে আনা ২ জনকে কেস দিয়ে কোর্টে চালান দেওয়া হলো দুপুর ১ টার দিকে। এর আগে অবশ্য ১১ টার দিকে ওসি মওদুদ (তদন্ত ওসি) আমাদের প্রথম ৫ জনের মধ্য থেকে যে ২ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়নি তাদের বাদ দিয়ে আমি সহ বাকি ৩ জনকে ডেকে নিল। উনার মোবাইলে ছবি তুললো। বললো ভেরিফাই করার জন্য ছবি তোলা হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যে ছাড়া পাব।
এই আশাটা আরো তীব্র হতে লাগলো। বললাম,ভাই একটু তাড়াতাড়ি করেন। কাল রাত থেকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে অথচ আমি তো কিছুই জানিনা।ঐ সময় একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম,একজন দোষী সবসময় বলে সে নির্দোষ কিন্তু একজন নির্দোষের কিছুই বলার থাকেনা।
যাই হোক, ১ টার দিকে যখন একজন পুলিশ এসে আমি সহ আরো ৫ জনের নাম ধরে ডেকে বললো যে আপনাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে,আপনাদের কোর্টে চালান দেওয়া হবে এখুনি… শুনেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আমার কাছে মনে হলো এটা অসম্ভব,এটা হতেই পারে না। আমি তো নির্দোষ, কিছুই জানিনা, ক্যাম্পাসে এসেছিলাম বাইক রাখতে। সেখান থেকে আমাকে ধরে আনা হয়েছে। আমার নামে মামলা কেন দেবে? তাছাড়া পুলিশ তাহলে কি ভেরিফিকেশন করলো? যতদূর জানি আমাদের প্রক্টর স্যারকে তো জানানোর কথা মামলা দেবার আগে, উনি তো একজন নিরপরাধ স্টুডেন্টের লাইফ ধ্বংস করে দিতে পারেন না। আমি চিল্লাই চিল্লাই কথাগুলো বলতে থাকলাম।
এর মধ্যে খবর পেয়ে আমাদের দুজন বন্ধু রাজন আর আলামিন আসলো। আমাদের তখন হাজত থেকে বের করার প্রিপারেশন নিচ্ছে। আমি রাজনকে বললাম প্রক্টর স্যারকে ফোন দিতে। স্যার ফোন ধরলেন না। আলামিন অবশ্য তার কিছুক্ষণ আগেও একবার এসেছিল। ওকে ডিপার্টমেন্ট এবং প্রক্টর স্যারকে জানানোর জন্য বলেছিলাম। আলামিনই সম্ভবত রাজনকে নিয়ে প্রক্টর স্যারের কাছে গিয়েছিল কিন্তু ওখানে কি কথা হয়েছে তাও জানতে পারিনি।
যাই হোক এদিকে রাজন প্রক্টর স্যারকে ফোন দিচ্ছে আর অন্যদিকে আমি চিল্লাচ্ছি এই বলে যে আমি তো কিছু করিনি, আমাকে কেন মামলা দিবে?
পুরো পৃথিবী মাথার উপর ভেঙে পড়তে লাগলো। আমার সেই মুহূর্তে শুধু আম্মুর কথা মনে পড়তো লাগলো। আমি পুরোটাই বোবা হয়ে গেলাম। আমাদের ৫ জনকে হাতকড়া পরানো হলো। জীবনের সব স্বপ্ন মনে হলো এক মুহূর্তেই কেউ ভীষণ জোরে আছাড় মেরে ভেঙে দিল। গাড়িতে উঠিয়ে ভার্সিটির সামনে দিয়ে সাইরেন বাজিয়ে আমাদের কোর্টে নিয়ে যাচ্ছে এমন সময় শিশির পুলিশের কাছে মামলার কাগজ দেখতে চাইলো, আমিও দেখলাম।
দেখে আমি এতটাই অবাক হলাম যেন বোবা থাকা অবস্থায় আরো বোবা হয়ে গেলাম। মামলায় লেখা ১৮ ফেব্রুয়ারি মারামারিকে কেন্দ্র করে মামলা দিয়েছে।
১৮ ফেব্রুয়ারি আমি গিয়েছিলাম মিরপুর BRTA তে, আমার বাইকের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার আনতে। আমার পকেট লাইসেন্সেটা তখনও ছিল।
এমনকি ঐদিন শামীম আহম্মেদ সুমন ভাইকে আমি ঢাবির TSC থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম মিরপুরে। ভাই আমার সাথে সন্ধ্যা পর্যন্ত BRTA তে ছিলেন।
আমি ঐদিন বাইকের রেজিস্ট্রেশন পেপার ও নাম্বার পাবার পরপরই গ্লোবাল ইন্সুরেন্স থেকে বাইকের ইন্সুরেন্স করাই। এই সমস্ত পেপার তখনও আমার পকেটে ছিল এবং দুইটি পেপারেই ১৮ তারিখের কথা উল্লেখ আছে। যাই হোক,বাকি ঘটনা আর বলতে চাই না।
অবাক হতে হতে আর কাঁদতে কাঁদতে আমি ক্লান্ত। একজন নিরপরাধ এবং নিরীহ মানুষ হয়েও আমি জেলে বসে আছি। জেলখানায় এসে মায়ের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
প্রথম ২ দিন মা মা করে অনেক কেঁদেছি। এখন একটু শক্ত হয়েছি। আমি জানি আমার মা এখনো কাঁদছে।
এখন রাত ৩:১৫ বাজে, আমার মা ঘুমোতে পারেনি,মায়ের সাথে সন্তানের টেলিপ্যাথির জোরটা অনেক বেশি। বাবা মারা যাবার পর থেকে এই মানুষটা অনেক কষ্ট করছে আমার জন্য। অমানবিক কষ্ট করে যাচ্ছে বিগত ৫ টা বছর। একটু সুখে থাকার আশায় আমার চোখের দিকে তাঁকিয়ে আছে সারাক্ষণ। আমি জানি তাঁর সব স্বপ্ন এখন ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছে। আমার এখানে ফিজিক্যাল কোনো কষ্ট নেই, এটা আমার মাকে জানানো খুবই দরকার। মা, তুমি প্লিজ কান্নাকাটি করো না। আমি ভালো আছি মা। শুধু একটাই আফসোস মা, তোমাকে কোনোদিনও সুখ এনে দিতে পারলাম না। তোমার কষ্টটাকে মুছে দিতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও মা। অনেক ভালোবাসি মা তোমায়। এখানে এসে একটা কথা বুঝেছি। জেলের ভেতরে মানুষ জেল খাঁটেনা, জেল খাঁটে বাইরের মানুষ।
২০১৪ সালে বাবা মারা যাবার পর থেকে এই পর্যন্ত অমানবিক খাটুনি করে আর কষ্ট করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে আসছি। চালিয়ে আসছি আমার পরিবারটাকেও। জীবনে কখনো কোনো রাজনৈতিকদল বা সংগঠনের সাথে জড়িত হইনি। অথচ আজ আমি সেই রাজনৈতিক কারণেই জেলে।
নিজের আপন ছোট বোনটা মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় জীবনে ছোট বোনের ভালোবাসাটা তার কাছ থেকে পাইনি। পেয়েছি আমার চাচাতো বোনের কাছ থেকে। গত পরশু(শুক্রবার) তার বিয়ে হয়েছে। দাঁড়িয়ে থেকে ছোটবোনটার বিদায় পর্যন্ত দেখা হলো না।
ছোটবেলায় কাজী মারুফ অভিনীত “ইতিহাস” ছবিটি দেখেছিলাম। জেলে এসে প্রতিটা মুহূর্ত ছবিটার কথা মনে পড়ে। একজন নির্দোষ মানুষের জীবনে এরকম একটা ঝড় আসতে পারে এটা এখনও পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছি না। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মানুষের জীবন কতখানি বদলে যেতে পারে তার বড় সাক্ষী এখন আমি নিজেই। ক্যাম্পাসে শুধু বাইকটা রাখতে গেলাম, বের হলাম আর তারপর সবকিছু শেষ হয়ে গেলো। আমি চিন্তা করেছি এখান থেকে বের হয়ে বাড়ি ফিরে যাব মায়ের কাছে। আর তারপর আম্মু, আমি আর আমার প্রতিবন্ধী ছোট বোন এই ৩ জন মিলে সুইসাইড করবো। অনেক স্বপ্ন দেখেছিলা,মা কে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম। তার কোনোটাই এখন আর অবশিষ্ট নাই। স্বপ্ন না থাকলে, আশা না থাকলে ভাবলেশহীন জীবন কাটায়। আর স্বপ্ন ভেঙে গেলে মানুষ সুইসাইড করে, মৃত্যু কামনা করে। এটা যে আমার সুইসাইড নোট এমন কিছুও না। হয়তো বেঁচেই থাকবো। আত্মহত্যা করার মত অতটা সাহসও হয়তো আমার হবে না। আমার এই কথাগুলো সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছাবে কিনা জানিনা। কেউ কোনোদিন জানবে কিনা তাও জানিনা,তবুও বলে যেতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত প্রক্টর স্যার, মাননীয় ভিসি স্যার আমাদের অভিভাবক। আমরা তাদের সন্তান। আপনাদের এমন এক সন্তান আজ জেলে আটকা আছে যে কিনা কিছু জানতো পর্যন্ত না। আপনাদের এমন এক নিরপরাধ সন্তান জেলে আছে যে কিনা কোনোদিন রাজনীতিটাও করেনি।
সংসার আর নিজের জীবনের ঘানি টানতে টানতে সময় পার করেছি।
হ্যাঁ,মানছি আপনার কিছু সন্তান অপরাধ করেছে,কিন্তু তার জন্য একটা নিরপরাধ নিরীহ মানুষ ফেঁসে গেল। যার অপরাধ শুধু একটাই ক্যাম্পাসে বাইক রাখতে এসেছিল। আসল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে অথচ পরিস্থিতি শান্ত করার নামে এমন একটা মানুষের বলিদান দিলেন যার কিনা দুইকুলে কেউ নেই। আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ রইলো স্যার,ভবিষ্যৎে আপনার কোনো নিরপরাধ সন্তানের জীবনটা যেন এভাবে নষ্ট না হয়ে যায়।
মামলা দেবার আগে একটাবার হলেও একটু দেখে নিবেন বৃহত্তর স্বার্থে কোনো নিরীহ ছাত্র যেন কখনো বলির পাঠা না হয়ে যায়।__________
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরাণিগঞ্জ) থেকে
এহসান হাবিব সুমন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
১১ তম ব্যাচ
ফিন্যান্স বিভাগ।
গ্রামঃ নওয়াগ্রাম
থানাঃ কালিয়া
জেলাঃ নড়াইল

