জামালপুরের গান্ধী আশ্রম

Date:

একাত্তর বাংলা ডেস্ক

জামালপুর জেলার সদর উপজেলার মেস্টা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পল্লীর বুক চিরে প্রবাহিত ঝিনাই নদী। এই নদীর মায়াময় আদরিণী কন্যাই হাজীপুর গ্রাম। গ্রামের নামেই প্রতিষ্ঠিত হাজীপুর বাজার। বাজারটি ঝিনাই নদীর তীরে অবস্থিত। বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের নিভৃত জনপদ কাপাসহাটিয়া গ্রাম। গ্রামটি বর্তমান মেলান্দহ উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী। এই গ্রামেই ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গান্ধী আশ্রম। জামালপুর শহর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে যে গ্রামে সহজে প্রবেশ করা ছিল দুষ্কর, দুরূহ। কারণ একে তো আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ, এরপর আবার খরা-বৃষ্টির প্রাকৃতিক লীলা-খেলা। গ্রামের সরকার পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন স্বদেশিপ্রেমী জামালপুর মহকুমা কংগ্রেস নেতা নাসির সরকার। যিনি শৈশব-কৈশোরে স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। যুক্ত হন ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রাম এবং মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত অহিংস-সত্যাগ্রহ আন্দোলনে। তার দেশপ্রেম, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে তিনি ১৯৩১ সালে জামালপুর মহকুমা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সমাজ, রাষ্ট্রের মানব কল্যাণে যিনি ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন গান্ধী আশ্রম। তার আশ্রম পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করেন নাসির সরকারের সংগ্রামী কন্যা রাজিয়া খাতুন ও মানবহিতৈষী মহাননেতা মোয়াজ্জেম হোসেন। ওইসময় তাদের সহযোগিতা করেন, তৎকালীন জামালপুর মহকুমা কংগ্রেস সভাপতি ডা. রমনী মোহন দাস, ডা. ওয়াসিম উদ্দীন, ডা. মহসীন খন্দকার, সৈয়দ করিমুজ্জামান, মতিউর রহমান, বিধুভূষণ সেন, সতীশ চন্দ্র গুহ, কিরণ চন্দ্র দে, সুধীর রঞ্জন তালুকদার, সুকুমার মজুমদার, গিয়াস উদ্দীন আহম্মেদ, তৈয়ব আলী আহমেদ, ধীরেন্দ্র চন্দ্র দাস, জগদীশ মজুমদার, বেণী সোম, নরেশ সোম, অমূল্য মোহন দে ও মোহন সাহাসহ অত্রাঞ্চলের নামীদামি অনেক নেতা-কর্মীরা। প্রতিষ্ঠাকালে আশ্রমের কার্যক্রম শুরু হয়, খাদি কাপড় বোনন, শিক্ষাসেবা, পাঠাগার কার্যক্রম, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সমাজ ও ব্যক্তি উন্নয়ন কার্যক্রম, হস্তশিল্পের প্রসার ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে। প্রতিষ্ঠালগ্নে আশ্রমটি এলাকার জনমানুষ এবং জ্ঞানী-গুণীদের ভরসার আড্ডাস্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আশ্রমটি গুঁড়িয়ে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় আশ্রমের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম। টিকে থাকে জায়গা-জমি, আশ্রমে ব্যবহৃত চরকা, চেয়ার-টেবিল, শিক্ষার্থীদের তৈরি নানান সূচিকর্ম, পাঠাগারের দুর্লভ বই-পুস্তকসহ বিভিন্ন সামগ্রী। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা আশ্রমে হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি, ওই সময় আশ্রম প্রতিষ্ঠাতা নাসির সরকারকে অমানুষিক নির্যাতন করে তার পাঁজরের হাড়গোড় ভেঙে দিয়ে মেলান্দহের মালঞ্চ নামক এলাকার এক জঙ্গলে ফেলে দেয়। পরে তাকে এলাকার জনমানুষ উদ্ধার করে দীর্ঘদিন ময়মনসিংহের হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। ১৯৪৮ সালে আবারও সন্ত্রাসীরা হামলা করে আশ্রমে। ওই সময় আশ্রমের সব অবকাঠামো ধ্বংস করে ফেলে, নড়েবড়ে অবস্থায় টিকে থাকে শুধু আশ্রমের অফিস ঘরটি। পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় আশ্রমের সব ধরনের কার্যক্রম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই আশ্রমের ঘরটি মুক্তিযোদ্ধাদের অভয় আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। বাঙালির মুক্তির পথ অনুসন্ধানে প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে এই আশ্রমে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক সভা হয়েছে। কালের তাগিদে তাতে যারা যোগ দিয়েছেন, এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, বারীন দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জী, প্রফেসর শান্তিময় রায়, রবি নিয়োগী, নগেন মোদক, সুধেন্দু দাম, বিধুভূষণ সেন, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, মনোরঞ্জন ধর, নরেন নিয়োগী, রনেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, হাতেম আলী খান, আব্দুস সাত্তার, আশু দত্ত, হেমন্ত ভট্টাচার্য, মন্মথনাথ দে ও খন্দকার আব্দুল বাকীসহ অনেকেই। ২০০৭ সালের ২ অক্টোবর জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস উদ্‌যাপনকে উপলক্ষ করে গান্ধী আশ্রমের কার্যক্রম আবার শুরু হয়। চলছে একটি ট্রাস্টটি বোর্ডের মাধ্যমে। আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর’। সবুজ শ্যামলীমায় ভরা গ্রামটি এখন পাখ-পাখালিদের অভয়ারণ্য। সন্ধ্যা নামলেই পাখ-পাখালিদের কিচিরমিচির শব্দে এলাকা মুখরিত হয়। জাদুঘরটি দোতলায়, নিচের তলা সাজানো রয়েছে আলোকচিত্র দিয়ে। যেখানে চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠদের তথ্যাদি এবং ছবি। রয়েছে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যাদের ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন দিতে হয়েছে তাদের নামসহ তথ্য সংবলিত প্রদর্শনী বোর্ড। জাদুঘরের সিঁড়ির কাজেই খচিত খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। মুক্তিযুদ্ধের ১১নম্বর সেক্টরের একটি মানচিত্রও রয়েছে। সন্নিবিত হয়েছে জামালপুর-টাঙ্গাইল অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মুক্তি সংগ্রামের নানা স্মৃতিচিহ্ন, বধ্যভূমির মাটিসহ সংরক্ষণ করা হয়েছে স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে গান্ধী আশ্রমের ব্যবহৃত চরকা, পুরোনো সিন্দুক, চেয়ার-টেবিল, নানা ধরনের সূচিকর্ম। তৎকালীন নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র, কিষাণ-কিষাণীদের ব্যবহার্য সামগ্রী। প্রতিষ্ঠাতা নাসির সরকারের স্মৃতি ধরে রাখতে আশ্রমের নাসির সরকার স্মৃতি পাঠাগারের দুর্লভ সংরক্ষণ কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনো দণ্ডায়মান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি আলাদা গ্যালারিও রয়েছে। পর্যটকদের জন্য রয়েছে দৃষ্টিনন্দন অতিথিশালা। আশ্রম ঘিরে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের জ্ঞানপিপাসু পর্যটকরা ওই গ্রামটিতে আসা-যাওয়া করছে। সব মিলিয়ে গ্রামটি এখন এলাকার মানুষের কাছে প্রিয় এবং ঐতিহাসিক।

লেখক: শিক্ষক, নাট্যকার, সব্যসাচী লেখক এবং গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান