জয়ের নেশায় বিসর্জন
মোঃ সেলিম হোসেন
জয় চাই, চাই জয়
নাই আর কোনো ভয়।
আজকের এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত চলছে জয়ী হবার অদম্য প্রচেষ্টা। সফলতার নামে বিজয়ের পতাকা বা সেরার তকমা হাতে পাওয়ার জন্য সবাই চালিয়ে যাচ্ছে আপন আপন কৌশল। সেই প্রত্যাশিত জয় অর্জন করতে গিয়ে আপন বিবেক-বিবেচনা, সামাজিক নিয়ম-নীতি, রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান এমনকি ধর্মীয় বিধান কেও পায়ে ঠেলতে একবিন্দু দ্বিধা করছে না কেউ। রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতাধারী, সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মচারী কর্মকর্তা, বিদ্যার আধার নামক স্কুল-কলেজ, বিশ্বিবদ্যালয়, নেতাকর্মী, বাড়ির নেতা ব্যক্তি, এমনকি সকল সদস্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রচেষ্টা। যার ফলে সমাজ থেকে নৈতিকতা এবং মনুষ্যত্ব একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার একটা বিষয় আমি তুলে ধরছি। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ন্যায়-নীতির ধারক বাহক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষার ধারক এই শিক্ষা বোর্ড গুলিও আটঘাট বেঁধে নেমেছে প্রতিযোগিতায়। সকল বোর্ডের চাহিদা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে তাদের পার্সেন্টেজ থাকতে হবে সবার উর্ধ্বে। সত্যি বলতে কি সবার উর্ধ্বে ত থাকবে কোন একটা বোর্ডের নাম কিন্তু প্রচেষ্টা সকলের। যার ফল হিসাবে স্ব মূলে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা। এবং এটা কিভাবে হচ্ছে?
পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বৃদ্ধি করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহের উপর নিয়মমাফিক তদারকি চলে, ঠিক আছে। কিন্তু তার সাথে জুড়ে দেওয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের রেজিষ্ট্রেশন অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের হার, অংশ গ্রহণের পর পাশের হার। এই হার ঠিক না রাখতে পারলে প্রতিষ্ঠান কে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়, যা ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য সুনাম হানিকর। তাই প্রতিষ্ঠান গুলো ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে নামে জয়ের প্রতিযোগিতায়। অন্যদিকে বোর্ড গুলো পরীক্ষকদের সর্বোচ্চ নমনীয় হয়ে খাতা মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন। এতে খাতা মূল্যায়নকারী শিক্ষকদের অনেকেই তাদের মূল্যায়ন করা খাতায় যেন ফেল না থাকে সেই চেষ্টায় রত হয়। যার কারণে বেশির ভাগ অযোগ্য পরীক্ষার্থীরাও পাস করে সনদ পেয়ে যায়। এমন ফলাফল ধারাবাহিকভাবে চলার ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মক ভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে তা ঘটছে?
খুব স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল ছাত্রছাত্রীরা গণহারে যখন বছরের পর বছর পাস করে যাচ্ছে তা দেখে পরবর্তী তে সাধারণ মেধার, নিম্ন মেধার এমনকি একেবারেই জিরো মেধার ছাত্রছাত্রীরা পাসের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে লেখাপড়ার প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার কিছু পরীক্ষার্থীদের ইংরেজি পরীক্ষার আগের রাতে ঘুরাঘুরি ও আড্ডা দিতে দেখে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলে তাদের উত্তর যা ছিলোঃ পরীক্ষা তো স্যারেরাই দিবে। এহেন উত্তরে জনৈক ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে সেখান থেকে ফিরে দুঃখের সাথে আলোচনা করেন শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে।
এই যদি হয় শিক্ষা ব্যবস্থা, তাহলে জাতি কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? একই পরিস্থিতি দেশের সকল শাখায়। আর এর পিছনে কাজ করছে জয়ের নেশা।
জয়ের নেশা বা প্রতিযোগিতা প্রয়োজন কিন্তু তা মনুষ্যত্ব বিবর্জিত হয়ে হলে জাতি অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে। বিপরীতে নৈতিকতা বজায় রেখে হলে জাতি এগিয়ে যাবে সার্বিক উন্নতির শিখরে।

