এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম-ইউনেস্কো মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড

Date:

একাত্তর বাংলাঃ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের এই ঘোষণায় নিপীড়িত বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে।

সেই ঘটনার ৪৬ বছর পর বিশ্ববাসীর কাছে এই ভাষণকে তুলে ধরা হলো বিশ্ব ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রামাণিক দলিল হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ আজ ইউনেস্কোর মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারের অংশ।

এই ৪৬ বছরে ৭ মার্চের সেই ভাষণকে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৎকালীন বাঙালি সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষণটি ধারণ, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে প্রাণ বাজি রেখেও তা সযত্নে সংরক্ষণ এবং সরকারের পালাবদলের অস্থির সময়ে তা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা থেকে শুরু করে এর পূর্ণাঙ্গ লিখিত রূপ তৈরি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আবেদন – ভাষণটিকে কম পথ পেরোতে হয়নি আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে।

যেভাবে মিললো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি- ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিমসটেকের বর্তমান মহাসচিব শহীদুল ইসলাম। তিনি জানান বাকি গল্পটা।

শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড-এ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টারি হেরিটেজ হিসেবে রেজিস্টার্ড হওয়ায় কোটি কোটি বাঙালির মতো আমিও অনেক খুশি। বিশেষ করে ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আমি ঐতিহাসিক ভাষণটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের যে প্রক্রিয়া- এর সঙ্গে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত ছিলাম। কাজেই আমার জন্য এটা ব্যক্তিগত সন্তুষ্টিরও কারণ।’

তিনি জানান,‘প্যারিস মিশন থেকে আমরা চেষ্টা করেছি, বাংলাদেশের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সেটাকে ইউনেস্কোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার। এক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। এদের সঙ্গে মিলে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তবে সব উদ্যোগ যে সফল হয়েছে, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু জামদানি শাড়ি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শীতলপাটি কালচারাল হেরিটেজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।’

‘আমার প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিলো যে, ইউনেস্কোর মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড-এ বাংলাদেশের কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। এ ব্যাপারে প্রথমেই মনে আসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা।’

‘এটার ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওযার আবেদন করতে একই নমিনেশন ফাইল তৈরি করতে হয়। তাতে এটি লিখিতভাবে আছে, না অলিখিতভাবে আছে এবং তাতে যে কন্টেন্ট আছে, সেটা বিশ্বের মানব সম্প্রদায়ের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিনা- সেটার বিবেচনারও একটি বিষয় ছিলো।’

এই নমিনেশন ফাইল তৈরিতে শহীদুল ইসলামকে সাহায্য করেছিলেন বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান। তার ভেতরে প্রথমেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। তিনি প্রাথমিক নমিমেশন ফাইল তৈরিতে বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন বলে জানান সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।

এরপর এই ফাইলের যাচাই-বাছাই ও উন্নত করার জন্য তিনি  আলাপ করেন তৎকালীন ডিএফপির ডিজি লিয়াকত আলি খানের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাথমিকভাবে যে ফাইলটা তৈরি করেছিলো, তাতে শুধুমাত্র তাদের কাছে থাকা ফর্টি ফাইভ আরপিএম রেকর্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা দেয়া হয়। প্যারিস মিশন খোঁজ করতে শুরু করে এই ভাষণের অন্যান্য দলিলের।

শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এক্ষেত্রে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট যে অরিজিনাল আনএডিটেড ডকুমেন্টটা ছিলো। সেটি হলো তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার নাসের আহমেদ চৌধুরীর করা রেকর্ডটি। এটাই পরবর্তীতে ৮ মার্চ রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হয়েছিলো। এছাড়াও ৭ মার্চ ভাষণের অরিজিনাল ৩৫ মিলিমিটার ভিডিও ফুটেজ- ধারণ করেছিলেন পাকিস্তান ফিল্ম ডিভিশনের চিফ মহিবুর রহমান খান।’

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ২০১৩ সালে এটির একটি ডিজিটাল অডিও ভিশন সংস্করণ তৈরি করে। আরও পরে ২০১৪ সালে ২০১৪ সালে তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তৈরি করে একটি সংষ্করণ। এর সবগুলোই প্যারিস মিশন জমা দেয় ইউনেস্কোর কাছে। এরপর যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়।

শহীদুল ইসলামের ভাষ্যে, ‘আমরা এটি জমা দিয়েছিলাম ২৩ মে ২০১৬ তে। তারপর এটি প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৭’র ফেব্রুয়ারিতে তারা এটি ফেরত দিলো কিছু সংশোধনের জন্য। এরপর ১৭ এপ্রিল ২০১৭ তে সংশোধনের পর আমরা এটা আবার জমা দিলাম। এরপর এদের চূড়ান্ত অথোরিটি ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার অ্যাডভাইজারি কমিটি এটা ৩০ অক্টোবর এই ভাষণটিকে স্বীকৃতি দেয়।’

শহীদুল ইসলাম আরও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নিজে দেখে প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন। প্রাথমিক নমিনেশন পাওয়ার পর ইউনেস্কোর নির্দেশে বেশ গোপনীয়তা রক্ষা করেই কাজটা করেন তারা।

এভাবেই বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকৃতি পায় বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম এই দলিল। নানা বন্ধুর পথ পেরিয়ে ৭ মার্চের এই ভাষণ তাই এখন কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান