একাত্তর বাংলাঃ মুক্তিযুদ্ধে যে ক’জন বিদেশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ‘আর্চার কেন্ট ব্লাড’। যাকে বাংলাদেশের যুদ্ধবিবেকও বলা হয়।
জেনারেল আর্চার কেন্ট ব্লাড একাত্তর সালে নিক্সন-কিসিঞ্জারের পাকিস্তানপন্থী অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। মার্কিন পলিটিক্যাল কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৬০ সাল থেকে ঢাকায় ছিলেন ব্লাড।
১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল থেকে ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হামলা শুরু করে তখন ব্লাডের স্টাফরা কার্যত বন্দী হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনিসহ আরও দুই কর্মকর্তা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের সাহায্যে রিপোর্ট করতে সক্ষম হন।
তবে এ রিপোর্ট ওই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা তখন পাকিস্তানকে সহায়তা করতে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।
টেলিগ্রামগুলোতেও ব্লাডের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তিনি সিলেক্টিভ জেনোসাইড শিরোনামে এক টেলিগ্রামে লেখেন ‘পাক সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার ভয়াবহতা একদিন প্রকাশ্যে আসবেই।’
এছাড়া ঢাকায় মার্কিন কর্মকর্তারা পঁচিশে মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া-ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা খুব ভেবেচিন্তে একটি প্রতিবাদলিপি লিখেছিলেন। এতে সই করেছিলেন ব্লাড ও তার ২০ জন সহকর্মী। তারা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন।
আর্চার ব্লাড শুধু সহযোদ্ধা নয়, বাংলাদেশের একমাত্র আমেরিকান সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাও বলা যায়।
কারণ, মার্কিন কূটনীতিক হয়েও তিনি তার ধানমন্ডির বাসার পেছনের বাগানে একদল বাঙালি পুলিশের অস্ত্র মাটি খুঁড়ে কয়েক দিন লুকিয়ে রেখেছিলেন।
বাংলাদেশের পক্ষে থাকার মাসুল দিতে হয়েছিল ব্লাডকে। কিসিঞ্জার ক্ষুব্ধ হয়ে ব্লাডকে দ্রুত ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে আনেন এবং তাকে মানবসম্পদ বিভাগে স্থানান্তর করেন।
১৯৭১ সালে ভিন্ন মতাবলম্বী টেলিগ্রামে স্বাক্ষর করা ২৯ রাষ্ট্রদূতের একজন হাওয়ার্ড বি স্কাফার বলেন, ‘ব্লাডের টেলিগ্রাম ওয়াশিংটনের নীতিতে কোন পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু তার ক্যারিয়ারে ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তিনি কখনও রাষ্ট্রদূত হতে পারেননি’।
মহান স্বাধীনতা দিবসে তার মতন পরম বন্ধুকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে বাংলাদেশ।

