সুমন ভৌমিকঃ অসাধারণ উদ্যোগ। ওসি আশিকুর রহমান এবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি সমাজের কাছে অপাংক্তেয় দেহ-জীবিকাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দঘাট থানার দৌলতদিয়া নিষিদ্ধ পল্লীতে চালু করেছেন পুলিশের নাগরিক সেবা-“জনগণের দরবার”। সেখানে প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ২ঘন্টা সময় দেবার কথা ভাবেছিলেন। তার এই ভাবনা ও কাজ এর খবর ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অসাধারণ আইডিয়া হিসাবে যা জনগণের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
দৌলতদিয়া নিষিদ্ধ পল্লীর নাম বদলে হয়েছে পূর্বপাড়া। সেখানে ওসি আশিক “জনগণের দরবার” করে সারাদেশে আলোরন সৃষ্টি করেছেন। এর আগে জনগণের কাছে যেতে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানায় খোলা আকাশের নিচে ও ঠাকুরগাও সদর থানায় দিনের বেলায় গাছতলায় বসে তিনি অফিস করে আলোচিত হন। আর ময়মনসিংহে মাদক বিরোধী যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে পুলিশের সুপারম্যান হিসাবে তিনি জনগণের মন জয় করেছিলেন।
দু’বছর পরেও ওসি আশিকুর রহমান এর নাম ময়মনসিংহ মনে রাখছে। ৫ জুলাই ২০১৭ থেকে ১৯ জুলাই ২০১৮ । মাত্র ১ বছর তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা সংস্থা’র অফিসার ইনচার্জ। সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষনার পর মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবর্তীণ হন তিনি। ভূমিকা আর সাফল্যের জন্য তার নাম কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয়তা পায় ময়মনসিংহে।
তথ্যাভিজ্ঞ মহল স্বীকার করেন, তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডায়নামিক ভূমিকায় ময়মনসিংহে মাদক রাজ্যের পতন ঘটে।
জেলা পুলিশকে মাদক নির্মূলে জ্বলন্ত সাফল্য উপহার দেন এই সাহসী, মেধাবী ও উদ্যমী গোয়েন্দা অফিসার। কিন্তু ময়মনসিংহ তাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি।
সেই আশিকুর রহমান এখন রয়েছেন রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দঘাট থানায়। অফিসার ইনচার্জ হিসাবে আশিকুর রহমান-এখন এমন এক স্থানে পুলিশের “জনতার দরবার” চালু করেছেন, যা অতীতে কেউ করার কথা ভাবেননি। এক্ষেত্রে সেখানে তিনি পথিকৃত হয়ে থাকলেন পুলিশের এক বিরল উদ্যোগ এর জন্য। যা শুধু সেখানেই নয় বরং সারাদেশে সচেতন মহলের নজর কেড়েছে। জনতার পুলিশ থিমটি আক্ষরিক অর্থেই অর্থবহ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যাকে “এক্সিলেন্ট ইনিশিয়েটিভ” হিসাবে আখ্যায়িত করছে।
আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী’র নির্দেশনায় বাংলাদেশ পুলিশ এর প্রতিপাদ্য জনতাই পুলিশ, পুলিশই জনতা সফল। পুলিশ এখন জনবান্ধব।
আর মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার। এই অঙ্গীকার রূপায়নে পুলিশ দেশব্যাপী নানা উদ্ভাবনী নজির রাখছে।
“জনতার দরবার” সেরকমই একটি উদ্ভাবনী সেবা। যার মাধ্যমে পুলিশ জনতার পাশে বসছে। তাদের সমস্যা, অভিযোগ তুলে ধরতে পারছে। পুলিশ তাৎক্ষনিক সকল সমস্যার সুরহা দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গড়া ডিজিটাল বাংলাদেশে “দ্রুততম সময়ে, নিকটবর্তী স্থানে, সাশ্রয়ী খরচে বা বিনামূল্যে সেবা প্রদান নিশ্চিত করাই ডিজিটালাইজেশন এর মূল কথা”। আর সেই ডিজিটাল এর ছুয়া লেগেছে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে। সাধারণ মানুষ থানায় না গিয়ে অনলাইনে জিডি করতে পারছেন। এছাড়াও সমাজের যে কোন সমস্যা ৯৯৯-এ কল করে দ্রুত সেবা পাচ্ছেন।
গোয়ালন্দঘাট থানার ওসি মোঃ আশিকুর রহমান এর “জনতার দরবার” তেমনি এক সেবা, যেখানে সেবা প্রদানের দীপ্ত প্রত্যয় নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। জনগণের কাছে গিয়ে তাদের জন্য তাৎক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশেষত্ব হচ্ছে ওসি আশিক যেখানে “জনতার দরবার” করছেন, সে স্থানটি হচ্ছে দৌলতদিয়া এবং যাদের জন্য এই সেবা চালু হয়েছে তারা হলেন সমাজের কাছে নিস্পৃহ মানুষ-যৌনকর্মী।
প্রান্তিক শ্রেনীর এই মানুষগুলোরও প্রয়োজন থাকে পুলিশী সেবার। অথচ ইতিপূর্বে নানা কারনে তাদের চাহিদা, দাবি, আর্তি ও রেড লাইট এরিয়ার চার দেয়ালের হাহাকার করতো। সেখানে সারাদেশে প্রথম দৃষ্টান্ত হিসাবে সহমর্মিতা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একান্ত আন্তরিক পদক্ষেপ হিসাবে “জনতার দরবার” চালু করলেন ওসি আশিক।
গত ২২ জানুয়ারি ওসি মোঃ আশিকুর রহমান তার ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে লিখেন “সবার কাছে যেটা পতিতা পল্লি সেটাকে আমি বলি দৌলতদিয়া পূর্বপাড়া, সবাই যাদের যৌনকর্মী বলে আমার কাছে তারা দৌলতদিয়া পূর্বপাড়ার নাগরিক। সেই নাগরিকদের সেবায় সেখানে আজ থেকে চালু করলাম আমার “জনগণের দরবার”। অভিযোগ দিতে তাদের আর থানায় আসতে হবে না। প্রতিদিন দুপুর ২টা হতে ৪টা পর্যন্ত আমি থাকব “জনগণের দরবারে”।
কর্মপ্রবণ এই ওসি’র পেশাদারিত্বপূর্ণ গণমুখী এই উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে সন্দেহ নেই। পুলিশের প্রতি তাদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস নতুনমাত্রা পেয়েছে।
পুলিশ সম্পর্কে জনমনে আরও একটি ইতিবাচক ধারনা বিকশিত হলো “জনগণের দরবার” সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে। এর প্রভাব জনমনে প্রশংসার সঞ্চার করেছে। পরিবর্তন এসেছে দৃষ্টিভঙ্গিরও। দৌলতদিয়ার নিষিদ্ধ পল্লীর নতুন নাম দৌলতদিয়া পূর্বপাড়া করা, পতিতাদের পূর্বপাড়ার নাগরিক বলে ডাকা সেই পরিবর্তনেরই দৃষ্টান্ত।
দেখা যাচ্ছে, স্বীয় কর্ম প্রবাহ গুণে ময়মনসিংহের জনমত জয় করা সেই দক্ষ প্রাক্তন জেলা গোয়েন্দা সংস্থা’র অফিসার ইনচার্জ মোঃ আশিকুর রহমান ফের আলোচনায় উঠে এসেছেন গোয়ালন্দঘাটের ওসি হিসাবে। যে খবর ময়মনসিংহসহ দেশব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টে রীতিমত ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একজন মন্তব্য করেছেন, তিনি যেখানেই যান সেখানেই জ্বলে উঠেন। যার বাস্তব চিত্র তিনি দেখিয়ে ছিলেন ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায়।
এর আগে বিএনপি-জামাতের পেট্রোল বোমা অগ্নি সন্ত্রাস-এ উপদ্রুত ভয়ঙ্কর এলাকা চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার তৎকালিন ওসি মোঃ আশিকুর রহমান উদ্ভূত রাজনৈতিক সহিংসতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে আলোচিত ও প্রশংসিত হন।
২০১৩ সালের জুনে পরিদর্শক পদে প্রমোশন লাভের পর ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ হিসাবে দায়িত্ব পালনে তিনি তার সাফল্যের অধ্যায় সূচনা করেন।
২০১৫ সাল থেকে ২ বছর রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)-তে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ময়মনসিংহে ওসি ডিবি হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে ১ বছরে মাদক বিরোধী অভিযানে নজিরবিহীন সাফল্যের রেকর্ড সৃষ্টি করে জনআস্থা অর্জন করেন এই অফিসার।
এসময় সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম ওসি ডিবি মোঃ আশিকুর রহমানকে পুলিশের সুপারম্যান বলে আখ্যায়িত করে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানায় কিছুদিন ওসি ছিলেন। এসময় তিনি হজ্বব্রত পালন করেন।
জানা যায়, নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি গ্রামের কৃতিসন্তান মোঃ আশিকুর রহমান ১৪ জানুয়ারী ১৯৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৩ সালে উপ-পরিদর্শক হিসাবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। সারদা পুলিশ একাডেমিতে ১১ মাস ১৬ দিন ট্রেনিং গ্রহন অবস্থায় ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর বিএনপি-জামাত জোট সরকার রাজনৈতিক কারনে অবৈধ আদেশে তাকে চাকরীচ্যূত করেন। তিনি অবৈধ আদেশের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই করে ৫ বছর পর ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ে চাকরী ফিরে পান।
এরপর উপ-পরিদর্শক হিসাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধীনে রমনা ও শাহবাগ থানায় দায়িত্ব পালন করে প্রায় ৪ বছর পর পরিদর্শক হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এই পুলিশ অফিসার পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ও নির্দেশনা রক্ষায় সদা তৎপর। তার কর্মজীবনে তিনি বরাবরই উর্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশিত দায়িত্ব পালনকালে সাফল্য অর্জনে তার নিষ্ঠা, মেধা ও কারিশমা দেখিয়েছেন। সর্বশেষ চমক গোয়ালন্দঘাটের দৌলতদিয়া নিষিদ্ধ পল্লীতে “জনতার দরবার”।
জানা গেছে, এর আগে ইন্সপেক্টর মোঃ আশিকুর রহমানের রয়েছে আরও একধিক সাফল্য এবং কিংবদন্তির গল্প। ২০১৮ সাল। অক্টোবর। তখন তিনি ময়মনসিংহ রেঞ্জ থেকে বদলী হয়ে রংপুর রেঞ্জে। দায়িত্ব নেন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অফিসার ইনচার্জ হিসাবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত খবরে বলা হয়, সেখানে ওসি আশিকুর রহমান খোলা আকাশের নিচে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন। কারন তিনি লক্ষ্য করেন, সেখানে সাধারণ মানুষ থানায় আসতে ভয় পায়। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সেখানে মানুষের মধ্যে পুলিশ ভীতি কাজ করে। অনেকে থানায় আসেন নেতা, উকিল ও সাংবাদিক ধরে। অনেকে থানায় এলে ওসি রুমে ঢুকতে চান না। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুলে। তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেন, জনগণের জন্য পুলিশ তাই তিনিই এবার জনগণের কাছে যাবেন। সেই মতে তিনি খোলা আকাশের নিচে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে জনমনে সাড়া পড়ে। অল্প দিনের মধ্যেই জনগণ সারাসরি তার কাছে আসতে শুরু করেন এবং স্বাছন্দবোধ করেন। সচেতন মহলের মতে, পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে এই প্রয়াস ছিল ইতিবাচক।
এরপর একই বছর (২০১৮) এর ঘটনা। এবার মোঃ আশিকুর রহমান ঠাকুরগাও সদর থানার অফিসার ইনচার্জ। মূল ফটকের ভেতরে থানা ভবন। যোগদানের কিছুদিন পর ৩১ অক্টোবর থেকে হঠাৎ করে ওসি আশিক দিনের বেলায় থানার বাইরে গাছতলায় বসতে শুরু করলেন। বিষয়টি এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। জনমনে প্রশ্ন-ওসি গাছতলায় কেন?
জানা গেল, পুলিশকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতেই নিজ থেকে ওসি মোঃ আশিকুর রহমান এই উদ্যোগ নেন। মিঠাপুরের মত ঠাকুরগাওয়েও সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে আসতে জড়তাবোধ করতো। তাই সেটা লক্ষ্য করে তিনি জনগণের জন্য গাছতলার নিচে অপেক্ষা করতেন, তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলে সমস্যার কথা শুনে সমাধান করে দিতেন।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, মাদক ও অপরাধী যেই হোক, তার কাছে কোন ছাড় নেই। এজন্য আলোচিত ও জনপ্রিয় এই পুলিশ অফিসার জনবান্ধব হিসাবে নিজের ইমেজ তৈরী করেছেন। বরাবরই তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলেন। পুলিশের ইমেজ বেড়ে যায় তার সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা ও আন্তরিকতায়।

