বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেন। তিনি প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে আজও অমলিন । দুনিয়াজুড়ে তার অসংখ্য ভক্ত। সবার কাছেই তিনি মহানায়িকা। দুনিয়াজুড়ে তার ভক্তের অভাব নেই। আজ (৬ এপ্রিল) স্বপ্নের সেই মহানায়িকার ৮৮তম জন্মদিন।

১৯৩১ সালে বাংলাদেশের পাবনা জেলায় তার জন্ম। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই ছিল তার শিক্ষাজীবন। এছাড়াও তার আরো একটি পরিচয় হচ্ছে তিনি কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী।
নিতান্ত ছেলেবেলা থেকেই অভিনয় এবং সংগীতের প্রতি একটা আলাদা টান ছিল । তার আসল নাম রমা দাশগুপ্ত। তিনি চলচ্চিত্রে ছিলেন মাত্র ২৬ বছর। আর এই সময়েই তিনি মানুষের অন্তরে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন।
১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। তাদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী। এছাড়াও সুচিত্রার দুই নাতনী হলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা সেন ও রিয়া সেন।
বিয়ের পরে ১৯৫২ সালে ‘শেষ কথায়’ রূপালি পর্দায় নায়িকার ভূমিকায় প্রথম আত্মপ্রকাশ তার। পাবনার রমার নাম বদলে হয় সুচিত্রা। কিন্তু ছবিটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা অভিনীত তার দ্বিতীয় ছবি সাত নম্বর কয়েদী মুক্তি পায়। আর এই ছবির মধ্যে দিয়েই রূপালী পর্দায় দর্শক প্রথম এই মহানায়িকার অভিনয় দেখতে পান। আর তার পরেরটা শুধুই ইতিহাস। তার হাত ধরেই বদলে যায় বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকার সংজ্ঞা।
শুরুটা ১৯৫২ সালে হলেও জনপ্রিয়তা পান মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। যা বক্স-অফিসে সাড়া ফেলে এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটি উপহারের কারনে আজও স্মরনীয় হয়ে আছে। বাংলা ছবির এই অবিসংবাদিত জুটি যা পরবর্তী ২০ বছর ছিলেন আইকন স্বরূপ।
উত্তম কুমার ছাড়াও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অশোক কুমার, বসন্ত চ্যাটার্জীর সহ বেশ কিছু নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে অসাধারণ কিছু ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি।
সেইসাথে ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের স্ত্রী হিসেবেও অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন। ‘শাপ মোচন’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘সপ্তপদী’, ‘গৃহদাহ’, ‘হার মানা হার’, ‘হসপিটাল’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘সাগরিকা’, ‘দত্তা’ প্রভৃতি সিনেমায় সুচিত্রা সেন তার অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন।
বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে হিন্দি ছবির জগতেও সুচিত্রা করেছিলেন বেশ কিছু অসাধারণ সিনেমা। ১৯৫৫ তে ‘দেবদাস’ সিনেমায় দিলীপ কুমারের বিপরীতে পার্বতীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এ ছবিতে সুচিত্রা সেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেন। এরপর ‘মমতা’ এবং ‘আঁধি’ সিনেমার জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারের মাধ্যমে সুচিত্রার অভিনয় প্রতিভার প্রতি কুর্ণিশ জানিয়েছিল বলিউড।
সুচিত্রা সেন ১৯৬৩ সালে তার অভিনীত সাত পাকে বাঁধা ছবি দিয়ে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। এছাড়া ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পান। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলাবিভূষণ সম্মাননা দেওয়া হয় তাঁকে।
২০০৫ সালে সুচিত্রা সেনকে ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও সুচিত্রা সেন দিল্লিতে গিয়ে ওই সম্মান গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সুচিত্রা সেন অভিনীত শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। ওই বছরই তিনি সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে চিরতরে অবসরগ্রহণ করেন। বলা হয়ে থাকে, উত্তমকুমারের মৃত্যুর পরই প্রিয় মানুষটিকে হারানোর অভিমানে চলচ্চিত্র ত্যাগ করেন তিনি।
এরপর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। তার নায়ক উত্তম কুমার ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মারা গেলে সেই রাতে এসেছিলেন একখানি মালা হাতে। মহানায়কের দেহের ওপর মালা রেখে সুচিত্রা সেন ফিরে এলেন কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে, তারপর তিনি মিডিয়ার সঙ্গে আর কথা বললেন না। একাকী নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে লাগলেন।
৮৩ বছর বয়সে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে তিনি সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। তবে মৃত্যুতেও শেষ হয়নি সেই রহস্যময় সুচিত্রার গল্প। মহাপ্রস্থানের পরও সবার মনে জায়গা পেয়েছেন তার সেই মন ভোলানো হাসি।
সুচিত্রা সেনের ৮৮তম জন্মদিনকে নানা আয়োজন হাতে নেয়া হয়েছে সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি পাবনায়। কেক কাটা ও শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রয়াত এ নায়িকার জন্মদিনের উৎসব পালিত হবে ।

