একাত্তর বাংলাঃ ‘স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান’ -এই পঙ্ক্তির মধ্যেই রয়েছে মহান স্বাধীনতার প্রতি বাঙালির আবেগ ও শ্রদ্ধা।
এমনি আরও অনেক সৃষ্টিকর্মে উদ্ভাসিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের গানে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত কবি থেকে শুরু করে নবীনতম কবি-লেখক পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানি হানাদারদের নারী নির্যাতন, রাজাকারদের নির্মমতা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, সাধারণ মানুষের বেদনা, সাহসিকতা, শরণার্থী শিবিরের কষ্ট ইত্যাদি ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও নাটকে।শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা তার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ই লিখেছেন।
উপন্যাসটি শেষ করার আগেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর আলবদর ঘাতকদের হাতে শহীদ হন তিনি। এই উপন্যাসে গণহত্যা, পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ানক নির্মমতা ও নারী নির্যাতনের মতো বিষয়গুলোর বাস্তব চিত্র দেখা গেছে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে তার দিনলিপি। সেখানে ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধের কথা রয়েছে; রয়েছে অবরুদ্ধ ঢাকার পরিস্থিতি।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমির কথা রয়েছে এই গ্রন্থের একটি বড় অংশ জুড়ে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’তে মুক্তিযুদ্ধকে চিত্রিত করেছেন অন্তর্মুখী এক জীবনযোদ্ধার দৃষ্টিকোণ থেকে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘নেকড়ে অরণ্য’, ‘দুই সৈনিক’; সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘যুদ্ধ’, ‘কাকতাড়ুয়া’; আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, ‘অলাতচক্র’; শাহরিয়ার কবিরের ‘একাত্তরের যীশু’, ‘একাত্তরের পথের ধারে’; সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’; আমজাদ হোসেনের ‘উত্তরকাল’; আনিসুল হকের ‘জননী সাহসিনী ১৯৭১’, ‘মা’; জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’; মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কাচের সমুদ্র’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘ক্যাম্প’, ‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’; হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘সৌরভ’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘আগুনের পরশমণি’; রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষরে’; ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ উল্লেখযোগ্য। স্মৃতিকথার মধ্যে রয়েছে- এম.আর আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আত্মকথা ১৯৭১’, দ্বিজেন শর্মার ‘আমার একাত্তর ও অন্যান্য’, বাসন্তী গুহঠাকুরতার ‘একাত্তরের স্মৃতি’, সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়রি’, রাবেয়া খাতুনের ‘একাত্তরের নয়মাস’, মুনতাসির মামুনের ‘সেইসব পাকিস্তানি’, সিমিন হোসেন রিমির ‘আমার ছোটবেলা ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ’ ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র’-এর মধ্যে।
১৬ খন্ডে বিস্তৃত এই মহাগ্রন্থ সম্পাদনা করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান।শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘বন্দী শিবির থেকে’; নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘স্বাধীনতা উলঙ্গ কিশোর’; আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’; রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’; হেলাল হাফিজের ‘একটি পতাকা পেলে’, হুমায়ুন আজাদের ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?’; রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’; আসাদ চৌধুরীর ‘রিপোর্ট ১৯৭১’ ইত্যাদি কবিতা আমাদের নিয়ে যায় ১৯৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোতে।
আরও যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে আল মাহমুদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুহম্মদ নুরুল হুদা, নাসির আহমেদ, হাবীবুল্লাহ সিরাজি, আবদুস সামাদ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
আবুল হাসনাত সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নামে সংকলন গ্রন্থ দুটিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লেখকদের লেখা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ প্রকাশ করা হয়েছে অনেক বিদেশি লেখকের কলমে।অ্যালেন গিন্সবার্গের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, জর্জ হ্যারিসনের গান ‘বাংলাদেশ’, জোন বায়েজের ‘সং অফ বাংলাদেশ’-এর কথা প্রথমেই মনে পড়ে।
এই সারিতে আরও আছেন রবার্ট পেইন, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, সিডনি শনবার্গ, লরেন্স লিফশুলজ প্রমুখ।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচিশে মার্চের গণহত্যা, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, অবরুদ্ধ ঢাকা, শরণার্থী শিবির, বুদ্ধিজীবী হত্যা ইতাদি বিষয়ে শত শত বই প্রকাশ করা হয়েছে; লেখা হয়েছে গল্প, কবিতা, গান। ভবিষ্যতেও হয়ত মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে সৃষ্টি হবে কালজয়ী সাহিত্য।

