মো. নাসির উদ্দিন, টাঙ্গাইলঃ টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রুপা গণধর্ষণ ও ঘাড় মটকিয়ে হত্যা কান্ডের ঘটনা অল্প সময়ের মধ্যে মামলার সাক্ষী ও যুক্তিতর্ক সমাপ্ত করে আগামীকাল সোমবার ১২ ফেব্রুয়ারী মামলার ১৭১ দিনের মাথায় চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় দিতে যাচ্ছে আদালত। দ্রুত এই মামলার কার্যক্রম শেষ করে রায়ের অপেক্ষায় থাকা নিহতের পরিবার ও সাধারণ মানুষ আসামীদের সর্ব্বোচ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের কামনা করেছেন।
রুপার ভাই ২৮ আগস্ট মধুপুর থানায় এসে লাশের ছবি দেখে রুপাকে সনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর (৪৫), সুপারভাইজার সফর আলী (৫৫) এবং সহকারি শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীর (১৯) কে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের কাছে তারা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। ২৯ আগস্ট বাসের তিন সহকারি শামীম, আকরাম, জাহাঙ্গীর এবং ৩০ আগস্ট চালক হাবিবুর এবং সুপারভাইজার সফর আলী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তারা সবাই এখন টাঙ্গাইল কারাগারে আছে।
৩১ আগস্ট রুপার লাশ উত্তোলন করে তার ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাকে সিরাজগঞ্জের তাঁরাশ উপজেলার নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।
গত ৫ ফেব্রুয়ারী আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সমাপ্ত হলে টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া রায় ঘোষনার দিন ধার্য্য করেন। গত ৩ জানুয়ারি মামলার বাদির সাক্ষ গ্রহণের মধ্যদিয়ে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলার বাদি ও ভাই, জব্দ তালিকা, সুরতহাল রিপোর্ট, চিকিৎসক, ৫ আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহনকারী ৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৭জন সাক্ষী আদালতে তাদের স্বাক্ষ্য প্রদান করেন।
বিচারকের এ রায়ের দিন ধার্য করার মধ্য দিয়ে ঘটনার ১৭৩ দিন আর মামলার ১৭১ দিনের মাথায় আলোচিত ওই মামলার রায় হতে যাচ্ছে।
টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি একেএম নাছিমুল আখতার জানান, এই মামলায় আসামীদের জবাবন্দি ও বাদিসহ ২৭ জন সাক্ষির সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আসামীদের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছি। এদিকে বাদি পক্ষের আইনজীবি এস আকবর খান বলেন, মামলার সকল আসামী আদালতে স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি দিয়েছে। স্বাক্ষীরা যথাযথ স্বাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সবমিলিয়ে আমরা সকল আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড আশা করছি।
নিহত রুপা খাতুনের ভাই হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা আদালতের বিচারিক কাজে খুবই সন্টুষ্ট। আমার বোন রুপাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা ঐ সকল আসামীদের ফাঁসির দাবি জানাই। যাতে করে আর কোন মা বোনকে এমন নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।
চাঞ্চল্যকর রুপা গণধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি অত্যান্ত র্স্পশকাতর। গত ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালের বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রুপা খাতুনকে চলন্ত বাসে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্ষণ করে। পরে তাকে ঘাড় মুটকিয়ে হত্যা করে চলন্ত বাস থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে দেয়া হয়। পুলিশ ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বাদি হয়ে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে পত্র পত্রিকার খবর দেখে নিহতের ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় তার বোনের ছবি দেখে সনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনটি জব্দ করেন এবং আসামীদের গ্রেফতার করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। আসামীরা সেচ্ছায় আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাইয়ুম খান সিদ্দিকী মামলার তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর টাঙ্গাইল বিচারিক হাকিম আদালতে ৫ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্র দাখিলের পর দিন ১৬ অক্টোবর মামলাটি বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বদলী করা হয়। গত ২৫ অক্টোবর আদালত এ অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। ৩২ জনকে এই মামলায় স্বাক্ষী মানা হয়। গত ৩ জানুয়ারী বাদীর স্বাক্ষ গ্রহনের মধ্যদিয়ে স্বাক্ষী শুরু হয়। পরবর্তীতে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহনকারী ৪জন জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট, সুরতহাল রিপোর্ট ও জব্দ তালিকা সর্বমোট ২৭জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষী প্রদান করেন। আসামী পক্ষের আইনজীবি তাদের জেরা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট নাছিমুল আক্তার নাসিম। তার সহায়তায় ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী এস আকবর খান, মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এম এ করিম মিয়া ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ।
এদিকে আসামীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন, অ্যাডভোকেট শামীম চৌধুরী দয়াল ও অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন।

