নিজস্ব প্রতিবেদকন
ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের হাতে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে সোমালিয়া উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম। তিনি জানিয়েছেন, জাহাজে থাকা ২৩ নাবিক এখনো নিরাপদে আছেন। এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য জলদস্যুদের কবলে পড়া জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ ও নাবিকদের মুক্ত করা। সেই উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে কুয়ালালামপুর, নয়াদিল্লি, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে অবস্থিত বিভিন্ন দপ্তরকে খবর দেওয়া হয়েছে।
একই আশ্বাস দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, ‘জাহাজে থাকা নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা ২৩ জন নাবিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাহাজটি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছি। জাহাজ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চেয়েছি।’
কয়লা বোঝাই করে মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশে কবির গ্রুপের মালিকানাধীন ‘এমভি আবদুল্লাহ’। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল পূর্ব দিকের মহাসাগরে কয়েকটি স্পিডবোট ও মাছ ধরার বড় নৌকা নিয়ে সশস্ত্র দস্যুরা জাহাজে প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রণ নেয়। জিম্মি করে ফেলে এর ২৩ নাবিককে।
কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম বলেন, ‘জাহাজটি সোমালিয়া কোস্টের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। সোমালিয়া কোস্ট থেকে এখনো ৪১০ নটিক্যাল মাইল দূরে রয়েছে।
তিনি জানান, ‘জাহাজে থাকা নাবিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও ডাকাতদের সঙ্গে এখনো সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কাজেই কী কারণে জাহাজটি হাইজ্যাক করা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’ ওই অঞ্চলে চলাচলরত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের জাহাজগুলোকেও বাংলাদেশের জাহাজটির অবস্থা রিপোর্ট করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এর আগে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পতাকাবাহী এমভি জাহান মনির ছিনতাই করে সোমালি জলদস্যুরা। ওই জাহাজটিও ছিল কবীর গ্রুপের। সে সময় দর-কষাকষি করে চুক্তির মাধ্যমে ২৫ নাবিকসহ জাহাজটি ছাড়িয়ে আনে মালিকপক্ষ। তবে চুক্তির শর্ত কখনোই প্রকাশ করা হয়নি।
সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম বলেন, ‘২০১০ সালেও একই কোম্পানির আরেকটি জাহাজ হাইজ্যাক হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত নাবিকরা সবাই নিরাপদে আছেন।
দস্যুদের হাতে পড়ার পর জাহাজটির প্রধান কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ খান একটি অডিও বার্তা পাঠিয়েছেন। সেই বার্তায় ঘটনার বিবরণ ও বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে একটা হাই স্পিডবোট আমাদের জাহাজের দিকে আসতে থাকে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম দিই এবং সবাই ব্রিজে গেলাম। এরপর জলদস্যুরা চলে এল। তারা ক্যাপ্টেন ও দ্বিতীয় কর্মকর্তাকে ঘিরে ফেলল। আমাদেরকেও ডাকল এবং কিছু গোলাগুলি করল। তবে তারা কারও গায়ে হাত তোলেনি।
আরেকটি স্পিডবোটে আরও কয়েকজনের আসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এরপর একটা বড় মাছ ধরার জাহাজ আমাদের পাশে এসে পৌঁছাল। ইরানের মালিকানাধীন ওই জাহাজ এক মাস আগে জিম্মি করেছিল।’
তবে দস্যুরা আমাদের জাহাজ ও জিম্মিদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি করেনি বলে জানান এমভি আবদুল্লাহর প্রধান কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ। এরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্ত্রীকে এক বার্তা পাঠিয়ে আতিক বলেন, ‘টাকা না দিলে আমাদের মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে দস্যুরা।’
এদিকে, জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও বিপরীত দিক থেকে কোনো সাড়া পায়নি এমভি আবদুল্লাহর মালিকপক্ষ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, জলদস্যুরা নিরাপদ এলাকায় যাওয়ার পর সাড়া দিতে পারে।
গতকাল জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের মূল কোম্পানি কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিন্তু তাদের দিকে থেকে কোনো সাড়া পাইনি।’
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান, ‘জাহাজে থাকা নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা ২৩ জন নাবিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাহাজটি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছি। জাহাজ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘জাহাজটি এখন সোমালিয়া থেকে ছয় শ নটিক্যাল মাইল দূরে আছে। ফলে অপহরণকারীদের পরিচয়ের বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। এরা কোন দেশের নাগরিক সেটি সম্পর্কে আমরা এখনো কোনো তথ্য পাইনি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি ভারত মহাসাগরে ঘটেছে। আমরা ভারতের সহযোগিতাও চেয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রেখে কাজ করছি।’ এখনো অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি বলেও জানান তিনি।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছেন, সেকেন্ড পার্টির মাধ্যমে সরকার যোগাযোগের চেষ্টা করছে। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট ভবনে সাংবাদিকরা গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা দেড়টার দিকে সোমালিয়ার জলদস্যুরা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম কোম্পানির মোজাম্বিক থেকে দুবাইগামী জাহাজ এম ভি আব্দুল্লাহ দখল ও ২৩ জন বাংলাদেশি নাবিককে বন্দি করার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করলে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অত্যন্ত কনসার্ন এবং মন্ত্রিপরিষদ সভায় এটি অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জলদস্যুদের সঙ্গে কোনো ‘ফরমাল’ যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি, অন্য পক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটি নিয়ে তৎপর রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১০ বছর আগে জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল কবির গ্রুপেরই জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি’। নানা দর-কষাকষি করে তিন মাস পর সেই জাহাজ ও জিম্মি নাবিকদের দেশে ফেরানো হয়েছিল সে সময়।
সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল বলেন, ‘জলদস্যুদের একটি কৌশল হলো জাহাজ নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে সেফ জোন তৈরি করে। তারপর সেখান থেকে নিজেদের ডিমান্ড জানায়। এখন পর্যন্ত জলদস্যুরা কোনো ডিমান্ড আমাদের জানায়নি।’
জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তা বলেন, তাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে নাবিকদের অক্ষত অবস্থায় মুক্ত করা। তারপর জাহাজ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা।
জাহাজের ২৩ নাবিক এখন জলদস্যুদের হাতে জিম্মি। মুক্তিপণ না দিলে জলদস্যুরা তাদের একে একে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলেও স্বজনদের জানিয়েছেন নাবিকরা।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থের একটি পরিমাণ বললেও মিজানুল ইসলাম বলেন, ওগুলো ভিত্তিহীন। জলদস্যুদের সঙ্গে তো কোনো যোগাযোগই হয়নি।
এদিকে, জাহাজ থেকে বেশ কয়েকজন নাবিক তাদের পরিবার সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছেন। এ সময় তারা বলেছেন, জলদস্যুরা তাদের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। জাহাজটিতে ভয়ানক অগ্নিঝুঁকিও রয়েছে।
জাহাজটির চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খান জিম্মি হওয়ার পর ৩ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের একটি অডিও বার্তা পাঠান। জলদস্যুদের কবলে পড়ার সম্পূর্ণ ঘটনাটি বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জানিয়েছেন জাহাজ ও তাদের বর্তমান পরিস্থিতিও। তিনি অডিও বার্তায় বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার, আমি চিফ অফিসার আবদুল্লাহ বলছি। আজকে (মঙ্গলবার) সকালে জাহাজের সময় আনুমানিক সাড়ে ১০টার সময়, জিএমটি ৭টা ৩০ মিনিটে একটা হাইস্পিড বোট আমাদের দিকে আসছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা অ্যালার্ম দিয়ে ব্রিজে গেলাম। ওখান থেকে পরে সিটে চলে গেলাম। ক্যাপ্টেন স্যার ও সেকেন্ড অফিসার ব্রিজে ছিলেন। আমরা ঝিকঝাক কোর্স করলাম। তারপর এএসএস (জীবন বাঁচানোর জরুরি বার্তা) করলাম। ইউকে এমটিও (যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন) যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করেনি। এর মধ্যে জলদস্যুরা চলে আসে। এরপর ওরা ক্যাপ্টেন স্যার ও সেকেন্ড অফিসারকে ক্যাপচার করল। আমাদের ডাকল। আমরা সবাই গেলাম। আমাদের ডেকে কিছু গোলাগুলি করল। আমরা একটু ভয় পেয়েছিলাম। সবাই ব্রিজে বসে ছিলাম। কারও গায়ে হাত তোলেনি। শুধু সেকেন্ড অফিসারকে হালকা একটু ইয়ে করেছে।’
আতিকুল্লাহ খান বলেন, ‘তারপর ওরা আরেকটি স্পিডবোটে করে আরও কয়েকজন চলে এল। এভাবে মুহূর্তেই প্রায় ১৫–২০ জন চলে আসে। এর কিছুক্ষণ পরে একটি বড় ইরানিয়ান ফিশিং বোট নিয়ে আরও জলদস্যু চলে আসে। ইরানিয়ান ওই ফিশিং বোটটি এক মাস আগে তারা ক্যাপচার করেছিল। এটি দিয়ে তারা এক মাস ধরে নতুন কোনো জাহাজ জিম্মি করার জন্য সাগরে ঘোরাঘুরি করছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সামনে পড়ে গেলাম। এই ফিশিং বোটের তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের জাহাজে থাকা পাম্প দিয়ে কিছু ডিজেল নিয়ে ওই বোটে দিয়েছে তারা। তেল দেওয়ার পর আমাদের জাহাজে উঠে জিম্মি করা ফিশিং বোটটিকে ছেড়ে দেয়।’
‘তারপর ওরা আমাদের সেকেন্ড ও থার্ড অফিসারকে নিয়ে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে যায়। তাদের নিয়ে গিয়ে জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। এখন পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। আল্লাহর রহমতে জাহাজের কোনো ক্ষতি হয়নি। আমাদেরও কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সবাই ভয়ে আছি। ওরা খুব ভয় দেখাচ্ছে।’
বার্তায় আতিক উল্লাহ খান আরও বলেন, ‘আমাদের জাহাজে ২০-২৫ দিনের খাবার আছে। প্রায় ২০০ টনের মতো। সবাইকে বলেছি, এগুলো একটু সাবধানে ব্যবহার করতে। শেষ হয়ে গেলে বিপদে পড়ব আমরা। তবে একটা সমস্যা হচ্ছে, আমাদের জাহাজে কিছু কোল্ড কার্গো আছে। প্রায় ৫৫ হাজার টন। এগুলো একটু ডেঞ্জারাসও। ফায়ারেরও ঝুঁকি আছে। মিথেন বাড়ে। লাস্ট যখন অক্সিজেন মেপেছি তখন ৯-১০ শতাংশ লেভেল পেয়েছি। এটি নিয়মিত মনিটরিং করতে হয়। কোনো কারণে অক্সিজেন লেভেল বেড়ে গেলে বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে হবে। এটার একটু ব্যবস্থা করবেন, স্যার। আমাদের জন্য দোয়া করবেন, স্যার। আমাদের পরিবারকে একটু দেখবেন, স্যার। সান্ত্বনা জানাবেন, স্যার। আসসালামু আলাইকুম।’

