মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান:
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। এ নির্বাচনে সিটি মেয়র ও কাউন্সিলরগণ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধভাবে সম্পন্নের জন্য সরকার এ আইনের অধীন বিধিমালা প্রণয়ন করেছে।
বিধিমালার ৩ ধারায় নির্বাচনে প্রচারণার ক্ষেত্রে সকল প্রার্থীর সমান অধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দলের কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী যাই হোক, তিনি সমান সুযোগ পাবেন।
বিধিমালার ৪ ধারায় চাঁদাদান গ্রহণ, অনুদান প্রদান ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে কোনো প্রার্থী বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে রাজনৈতিক দল, অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো প্রকার চাঁদা বা অনুদান প্রদান করতে বা প্রদানের অঙ্গীকার করতে পারবেন না। বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে কোনো প্রার্থী প্রতীক বরাদ্দের পূর্বে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার করতে পারবেন না।
নির্বাচনকালে প্রার্থীদের সার্কিট হাউজ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিধিমালার ৭ ধারায় সভা-সমিতি, অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে রাজনৈতিক দল, অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পথসভা ও ঘরোয়া সভা ব্যতীত কোনো জনসভা বা শোভাযাত্রা করতে পারবেন না। এমন সভা করতে চাইলে সভা অনুষ্ঠানের ২৪ ঘন্টা পূর্বে তার স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। তবে জনগণের চলাচলের বিঘ্ন ঘটতে পারে এমন সড়কে পথসভা বা মঞ্চ স্থাপন করতে পারবেন না। প্রতিপক্ষের পথসভা, ঘরোয়া সভা বা অন্যান্য প্রচার পন্ড বা বাঁধা প্রদান বা গোলযোগ করা যাবে না।
পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল সম্পর্কে বলা হয়েছে – পোস্টার সাদা-কালো রংয়ের হতে হবে। আয়তন ৬০ বাই ৪৫ সে.মি. এর অধিক করা যাবে না। পোস্টারে ছাপানো ছবি পোট্রের্ট আকারের হতে হবে, কোনো অনুষ্ঠান বা মিছিলে নেতৃত্বদান বা প্রার্থনারত অবস্থার ছবি ছাপানো যাবে না। নির্বাচনী প্রতীকের আকার ৩ মিটারের অধিক করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারণায় অন্য কারো নাম, ছবি বা প্রতীক ছাপাতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হলে দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন।
কোনো প্রার্থী তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও মুদ্রণের তারিখ বিহীন কোনো পোস্টার লাগাতে পারবেন না। কোনো দেওয়াল বা যানবাহনে পোস্টার লাগাতে পারবেন না।
বিধিমালার ৯ ধারায় বলা হয়েছে, প্রার্থী তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান ভোটের স্লিপ প্রদান করতে পারবেন। তবে সে স্লিপের মুদ্রণকারী, প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, সংখ্যা ও তারিখ থাকতে হবে। প্রতীক হিসেবে জীবন্ত প্রাণি ব্যবহার করা যাবে না।
১১ ধারায় বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বা দাখিলের সময় কোনো মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না। ৫ জনের অধিক সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বা দাখিল করা যাবে না।
নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন প্রসঙ্গে ১২ ধারায় বলা হয়েছে- মেয়র পদে প্রার্থী প্রতি থানায় একটি করে ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রতি ৩০ হাজার ভোটারের জন্য একটি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। তবে ক্যাম্পে টেলিভিশন, ভিসিয়ার অথবা ডিভিডি ব্যবহার করতে পারবেন না।
যানবাহন ব্যবহার সংক্রান্ত ১৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কোনো হেলিকপ্টার, ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন কিংবা যান্ত্রিক যানবাহন সহকারে মিছিল, শোডাউন বা মশাল মিছিল করতে পারবেন না। তবে দলীয় প্রধান শুধু যাতায়াতের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন। ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত চৌহদ্দির মধ্যে মোটরসাইকেল চালাতে পারবেন না।
কোনো প্রার্থীর পক্ষে কোনো ভোটকেন্দ্রে বা ভোটকেন্দ্র হতে ভোটারদের আনানেওয়ার জন্য যানবাহন ব্যবহার বা ভাড়া করা যাবে না। কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোনো গাড়ি ভোটকেন্দ্রের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে পারবে না।
দেওয়ালে বা যানবাহনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে লেখা যাবে না। গেইট, তোরণ, ঘের নির্মাণ করা যাবে না। ৩৬ বর্গমিটারের বড় ক্যাম্প বা প্যান্ডেল নির্মাণ করা যাবে না। আলোকসজ্জা করা যাবে না। সড়ক বা জনপথে ক্যাম্প করা যাবে না। প্রার্থীর প্রতীক দিয়ে টিশার্ট, জ্যাকেট বা ফতুয়া বানানো যাবে না। ভোটারদের পানীয় বা খাদ্য পরিবেশন করা যাবে না, উপঢৌকন বা বকশিস দেওয়া যাবে না।
বিধিমালার ১৮ ধারায় প্রার্থীর উস্কানিমূলক বক্তব্য, আচরণ, স্ট্যাটাসে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র হরণ করে বক্তব্য, কোনো প্রকার তিক্ত, উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা লিঙ্গবৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। নির্বাচন উপলক্ষে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন বা অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা যাবে না। গোলযোগ বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে কারো শান্তি ভঙ্গ করা যাবে না। ভোটারদের প্রভাবিত করতে বল প্রয়োগ বা অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
সন্ত্রাসের উপাদান হলো বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ। বিধিমালার ১৯ ধারায় ভোটকেন্দ্রের চৌহদ্দিতে বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ বহনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বাচনী প্রচার করা যাবে না। একটি
ওয়ার্ডে একের অধিক মাইক ব্যবহার এবং তা ২টা থেকে ৮টার মধ্যে ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে।
নির্বাচনে সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সরকারি চাকরিজীবীর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ আছে। তাই এর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে বলা হয়েছে, তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ গ্রহণ করতে পারবেন না। তবে ভোটের দিন ভোট দিতে যেতে পারবেন। কোনো প্রার্থীরা সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র, সুযোগ সুবিধা বা কর্মচারীদের ব্যবহার করতে পারবেন না। নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে কর্তৃত্ব বা এ সংক্রান্ত সভায় অংশ নিতে পারবেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো সভায় অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা, ভিত্তি ফলক স্থাপন বা উন্মোচন করতে পারবেন না এবং উক্ত প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ প্রদান বা অর্থ ছাড় করতে পারবেন না। প্রার্থী প্রচার কাজে বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
অনেক জায়গায় প্রার্থীরা মনোনয়ন পত্র উত্তোলন, দাখিল বা প্রত্যাহারে বাধার সম্মুখীন হন। বিধিমালার ২৮ ধারায় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত যে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ভোটার ছাড়াও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রবেশ করতে চায়। এ সংক্রান্ত বিধিমালায় বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনি কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রার্থী, এজেন্ট, পর্যবেক্ষক, কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও ভোটারদের প্রবেশাধিকার থাকবে। প্রার্থীর কোনো কর্মী প্রবেশ করতে পারবে না। প্রার্থীর পক্ষে কেউ অর্থ, অস্ত্র, পেশীশক্তি বা স্থানীয় ক্ষমতা দ্বারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারবে না।
এসব বিধিনিষেধ অমান্য করলে ৬ মাস কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। যে কোনো উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্যে যদি কমিশনের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, এরূপ বিধিনিষেধ লংঘনের কারণে প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন, তাহলে কমিশন তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে কমিশন সন্তুষ্ট না হলে প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল করতে পারেন।

