নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামে গ্যাস বন্ধ থাকায় রাস্তায় গাড়ি কম। বাসায় রান্না না করতে পারায় রেস্টুরেটে মানুষের ভিড়। ছবি : খবরের কাগজ
চট্টগ্রামে গ্যাস বন্ধ। ফলে চুলা জ্বলে না এবং গাড়ি চলে না। রেস্টুরেটে খাবারসংকট। ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন থেকেই গ্যাসের চাপ নেই। রান্নার চুলা জ্বলে মিটমিট করে। চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মানুষ। হোটেল-রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতে হচ্ছে খাবার। রেস্টুরেন্টেও একই দশা। গ্যাসের আকাল। আবাসিক, শিল্পকারখানা, ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চরম সংকটে পড়েছে চট্টগ্রামের মানুষ।
দেখা যায়, গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে চুলায় গ্যাস নেই। রান্না করতে না পেরে অধিকাংশ গৃহিণী বিকল্পব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেককেই আবার হোটেল থেকে পার্সেল এনে দুপুরের খাবার খেতে হয়েছে। নগরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য গাড়ির এক থেকে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন। গ্যাস সংগ্রহের জন্য এ লাইন দীর্ঘ হয়েছে। চট্টগ্রামের সর্বত্রই দেখা গেছে এমন পরিস্থিতি। সকাল ৮টা থেকে গ্যাস সরবরাহ থাকছে না। রান্নাঘরের চুলা থেকে রেস্টুরেন্ট, শিল্পকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন-সব জায়গাতেই গ্যাসের সংকট।
চট্টগ্রাম নগরে গাড়ি চলাচল কমে যায় শুক্রবার। ফলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষের ভিড় লেগে ছিল গাড়ির জন্য। সড়কে গণপরিবহনও আগের মতো ছিল না। রাস্তা ছিল অনেকটা ফাঁকা। নগরের মুরাদপুর, বহাদ্দারহাট, লালখান বাজার মোড়, ওয়াসার মোড় এলাকায় যানবাহনের জন্য কর্মজীবী মানুষের অপেক্ষা ছিল। অপর দিকে বাসায় রান্না করতে না পারায় রেস্টুরেন্টে খাবারের জন্য ভিড় করতে দেখা গেছে লোকজনকে। প্রাইভেট গাড়িগুলোর ভাড়া তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় রেস্টুরেন্টেও অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। কয়েকটি রেস্টুরেন্টের মালিক জানিয়েছেন, গ্যাস বন্ধ থাকবে এটা আগে থেকে জানতে পারলে অতিরিক্ত চাপ সামলানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদুল হান্নান বাবু খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই মাঝে মধ্যে গ্যাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় রেস্টুরেন্টে অর্ডার, বড় ডেলিভারি থাকলে বিঘ্ন ঘটে। তখন মালিকদের দিশেহারা হয়ে যেতে হয়। বর্তমান সময়ে গ্যাসের প্রেসার পাচ্ছি না। ফলে বিকল্পব্যবস্থা সিলিন্ডার মজুত রেখে রেস্টুরেন্ট চালাতে হচ্ছে। অনেক মালিকের পক্ষে সিলিন্ডার ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তারা চরম দুর্ভোগে পড়েন।’
নগরের দেওয়ান বাজার এলাকার গৃহিণী কুমকুম আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। তবে ভোটের সময় দুই দিন ৬ জানুয়ারি ও ৭ জানুয়ারি গ্যাস সরবরাহ বেশ ভালো ছিল। এরপর থেকে আবার চুলা জ্বলে না। বিকেলের দিকে গ্যাস আসে, তবে মিটমিট করে জ্বলে। গতকাল তো সকাল থেকে একেবারেই বন্ধ ছিল।
নগরীর সিআরবি এলাকায় ফোর স্টার সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন ও টাইগারপাস ইন্ট্রাকো সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এর মধ্যে প্রাইভেট কার, মিনি ট্রাক, মিনিবাস, মাইক্রোবাস এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশার আলাদা দুটি লাইন মূল সড়কে ছিল গ্যাসের জন্য। এতে সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
সিআরবি এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেট কারচালক মোহাম্মদ কবীর হোসেন বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে আছি সকাল থেকে। গ্যাস না থাকায় সমস্যায় পড়েছি। ফোর স্টার সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার লাইনটি প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা ছিল।
আবাসিক এলাকাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সকাল ৯টা থেকেই বাসিন্দাদের ভিড় করতে দেখা গেছে রেস্তোরাঁগুলোতে। নগরীর গ্রিন ভিউ আবাসিক এলাকার গৃহিণী বিবি আয়শা বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাস নেই। তাই দুপুরের রান্না করতে পারিনি। হোটেল থেকে পার্সেল এনে খাবার খেতে হয়েছে।’
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমদানি করা লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম খান বলেন, চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মূলত এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস না পাওয়ায় সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এবং আবাসিক পর্যায়ে সংকট বেশি দেখা দিয়েছে।
কেজিডিসিএলের সূত্রমতে, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৩১২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে চট্টগ্রামের দুটি সার কারখানায় দেওয়া হচ্ছে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাকি গ্যাস আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দেওয়া হয়। তবে সৃষ্ট সংকট সময়ে কি পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ রয়েছে, সে তথ্য অবশ্য জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

