নিজস্ব প্রতিবেদন॥ বাংলাদেশে বছরে পাঁচ হাজার শিশু বাঁকা পা (ক্লাবফুট) সমস্যা নিয়ে জন্ম নিচ্ছেন। তবে এটি এখন আর কোনো সমস্যা নয়। অভিভাবকরা একটু সচেতন থাকলে সহজেই চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁকা পায়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। জন্মের পর যত দ্রত সম্ভব পনসেটি পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করা উচিত। গত চৌদ্দ বছরে ওয়াক ফর লাইফ সফলতার সঙ্গে দেশে ৩০ হাজারের বেশি ক্লাবফুট শিশুকে চিকিৎসার আওতায় এনেছে। যাদের বেশির ভাগই চিকিৎসায় ক্লাবফুটমুক্ত হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুন) সকাল ১১ ঘটিকায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা বিআরডিবি হল রুমে বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ভালো ফলাফল পেতে জন্মের পর পর যত দ্রুত সম্ভব পনসেটি পদ্ধতিতে চিকিৎসকরা উত্তম। দাতা সংস্থা মিরাকেল ফিট ও অ্যাকশন অন পোভার্টির সহায়তায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দি গ্ল্যানকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত বাংলাদেশ ক্লাবফুট প্রকল্পের ওয়াক ফর লাইফ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, আরও উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আশরাফ হোসাইন, ঘাগড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম, চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম রতন, পরাণগঞ্জ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোঃ আবু হানিফ সরকার, সমাজ সেবা অফিসার মাকসুদা খানম, সমবায় অফিসার কামরুজ্জামান, ডি ডি বিআরডিবি অফিসার জাহিদ হোসেন, সেবা ও সাহার্য্য কেন্দ্র প্রতিবন্ধী কন্সালটেন্ট ডাঃ মোঃ গোলাম মোস্তফা যুব উন্নয়ন অফিসার রেজাউল করিম, তথ্য অফিসার ফারজানা, পাট অফিসার সাজিয়া, এটিও শ্রীবাস পাল, টিও মোস্তাফিজুর রহমান, এনজিও কর্মী ও সাংবাদিকগণ। দ্য গ্ল্যানকো ফাউন্ডেশন ও ওয়াক ফর লাইফের ফিজিওথেরাপিস্ট মোঃ ইমরান আহমেদ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, দেশে শিশুদের প্রতিবন্ধিতা দূরীকরণে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রকল্পের মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করছে। দ্য গ্লেনকো ফাউন্ডেশনের ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পটির মাধ্যমে ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত চৌদ্দ বছরে দেশে মোট ৩০ হাজার ৫০০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুই চিকিৎসার মাধ্যমে সাফল্য পেয়েছে।
ফিজিওথেরাপিস্ট মোঃ ইমরান আহমেদ বলেন ময়মনসিংহ প্রতি সোমবার, বুধবার ও বৃহস্পতি মেডিকা ডায়গোনোস্টিক সেন্টার, নেত্রকোনা রবিবার স্বাবলম্বী হাসপাতাল, জামালপুর মঙ্গলবার জিয়া হেলথ ক্লাবফুট রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকি। ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ওয়াক ফর লাইফ ক্লাবফুট পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে সেবামূলক এ কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়। মুগুর পা (ক্লাবফুট) বিশিষ্ট শিশুদের পরিবারকে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ সেবা কার্যক্রম চালু হয়। এরপর স্থান পরিবর্তন করে ২০১৯ সাল থেকে মেডিকা ডায়গোনোস্টিক সেন্টারের থেকে এটি পরিচালনা করা হচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে ক্লাবফুট শিশুদের অভিভাবকরা অফিস কক্ষে যোগাযোগ করতে পারবেন। আলোচনা শেষে দিবস উদযাপনে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন অতিথিরা। ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের মাঝে দুপুরে খাওয়া ব্যবস্থা এবং আর্থিক যাতায়ত ভাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ যাবত ময়মনসিংহে ক্লাবফুট ১৫৫০ জন রোগীর চিকিৎসা আওতায় এসেছে।
প্রসঙ্গত, ক্লাবফুট বা মুগুর পা কিংবা বাঁকা পায়ের পাতা শিশুর এক ধরনের জন্মগত ত্রুটি। জন্মগত ত্রুটি শিশুর শরীরের এক ধরনের সমস্যা যা শিশুর জন্মের সময় থেকেই দেখা যায়। এই ত্রুটি শিশুর এক বা একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যকলাপে সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলে। তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্য গ্লেনকো ফাউন্ডেশনের ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
“ক্লাবফুট” জন্মগত ত্রুটি সমূহের মধ্যে ক্লাবফুট অন্যতম। অনেকে একে মুগুর পা বলে থাকে। এটি জন্মগত শারীরিক বিকৃতি যেখানে শিশুর পায়ের পাতার আকৃতি বা অবস্থান ভিতরের দিকে মোচড়ানো থাকে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০০০ হাজার শিশু এই জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ক্লাবফুট এর সঠিক কারণ এখনো অজানা, তবে জিনগত এবং পরিবেশগত কারন বা মাল্টিফ্যাক্টোরিয়ালের সংমিশ্রণে এ বিকৃতি হতে পারে । কিছু কিছু স্থানে ক্লাবফুট নিয়ে কোনও শিশুর জন্মের কারণ কী তা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার রয়েছে যেমন- আধ্যাত্মিক প্রভাব, মন্ত্র, অভিশাপ বা সৃষ্টিকতা প্রদত্ত শাস্তি, সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ ইত্যাদি। কখনও কখনও মায়েদের বা বাবাদেরকে এর জন্য দোষারোপ করা হয়, যা একবারেই সঠিকনয়। ক্লাবফুটের চিকিৎসা নিয়েও আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারনা রয়েছে। কিছু মানুষের ধারনা তেল বা ঘি দিয়ে ম্যাসেজ করলে, ভূমিকম্পের সময় শিশুর পা সোজা করে ধরলে এমনকি কোন চিকিৎসা বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই পা ভাল হয়ে যেতে পারে। জন্মের পরপরই যত দ্রুত সম্ভব ক্লাবফুটের চিকিৎসা শুরু করা ভাল তবে সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে, জন্মের ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করা উত্তম ।
ক্লাবফুট যদি সঠিকভাবে এবং সময়ে সময়ে চিকিৎসা করা না হয়, এটি মারাত্বক বিকৃতির দিকে অগ্রসর হতে পারে। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আজীবন বিকলাঙ্গতা নিয়ে জীবন যাপন করতে হয়। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে তাদের শরীরের ভর পায়ের একপাশে পরে ফলে ত্বকের পৃষ্ঠের উপর ক্ষতের সৃষ্টি ও ব্যথার কারণ হয় এবং ব্যক্তিটি সাধারণ জুতা পরতে সক্ষম হয় না। এছাড়াও এরূপ দৃশ্যমান বিকৃতির জন্য লোকজন বিভিন্নভাবে বৈষম্য বা কুটক্তি করে। চিকিৎসায় অবহেলিত ক্লাবফুট নিয়ে জীবন যাপনকারী ব্যক্তিরা জীবনের সব ক্ষেত্রে বাধার মুখোমুখি হয় যেমন- শিক্ষা হতে বঞ্চিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমাবদ্ধ করে, সামাজিক অংশগ্রহন, দারিদ্রতা এবং সর্বোপরি সমাজ ও জাতির জন্য এরা একটা বোঝা হয়ে যায়। পূর্বের চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসার করার পর প্রাথমিক সংশোধনে কিছুটা উন্নতি হলেও শিশুদের অনেক অসুবিধা ও কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করতে হতো, কারন দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সন্তোষজনক ছিল না। পনসেটি পদ্ধতির মাধ্যমে এ সমস্যার চিকিৎসা করা যায়। এটি অত্যন্ত কার্যকর, সুলভ এবং স্থায়ী চিকিৎসা। আমেরিকান অর্থোপেডিক সার্জন ডা. ইগনেসিও পনসেটি বহু গবেষনার মাধ্যমে এ পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেন। বিশ্বজুড়ে ক্লাবফুট চিকিৎ্সার জন্য এই পদ্ধতিটি এখন সর্বজন স্বীর্কৃত। পদ্ধতিটির ফলাফল বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যকর যা বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবেষনার মাধ্যমে প্রমাণিত। এ পদ্ধতি ব্যবহারের পর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলগুলিও আগের পদ্ধতির তুলনায় খুব আশাব্যঞ্জক। পনসেটি পদ্ধতিটি ম্যানিপুলেশন, কাস্টিং, টেনোটমি এবং দীর্ঘ মেয়াদী ব্রেস ব্যবহারসহ একটি খুব সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি। তার এ আবিস্কারকে স্মরণীয় রাখতে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তার জন্মদিন ৩রা জুন কে বিশ্বক্লাবফুট দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে ২০১৩ সাল থেকে এই দিবসটি উদযাপন করে আসছে ক্লাবফুট চিকিৎসাসেবা নিয়ে কাজ করা ওয়াক ফর লাইফ নামক প্রকল্পটি। অষ্টেলিয়ান সংস্থা দি গ্লেনকো ফাউন্ডেশন ২০০৯ সাল হইতে বাংলাদেশে পনসেটি মেথড এর মাধ্যমে ক্লাবফুট চিকিৎসা কার্যক্রম ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্প শুরু করে। প্রকল্পটি দেশব্যাপী ২৯টি জেলায় বিস্তৃত লাভ করে। কলিন ম্যাকফারলেন, অষ্টেলিয়ান খেতাব প্রাপ্ত একজন সমাজ সেবক এ সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশে ক্লাবফুট চিকিৎসা কার্যক্রম বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুরুর পর থেকে অদ্যবদী বাঁকা পা বা ক্লাবফুট নিয়ে জন্ম নেয়া ৩০৬০০ শিশুর পা চিকিৎসার আওতাভুক্ত করে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে। তাছাড়াও প্রকল্পটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি পর্যায়ে ক্লাবফুট সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক কাজ করছে। যার ফলস্রুতিতে বেশিভাগ শিশুই এখন জন্মেও ৩ মাসের মধ্যেই চিকিৎসা গ্রহন করছে। দিবসটি উদযাপনে এবছর ওয়াক ফর লাইফ প্রতিপাদ্য হিসেবে” চিকিৎসায় ভাল ফলাফল পেতে জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব পনসেটি পদ্ধতিতে ক্লাবফুট চিকিৎসা শুরু করা উত্তম”। বিশ্বে ক্লাবফুট দিবসের পাশাপাশি ওয়াক ফর লাইফ অদ্য প্রোগামে (ত্রিশ হাজার) ৩০০০০ ক্লাবফুট শিশুর অন্তভূক্তি ও উদযাপন করেছে। বিশ্বে যা প্রোগ্রামটিকে একটি অনবদ্য রেকর্ড এ অন্তভুক্ত করেছে। ওয়াক ফর লাইফ প্রোগ্রামটি বিশ্বে ও অন্যতম বৃহত্তম একটি ক্লাবফুট প্রোগ্রাম ও একটি রোল মডেল। দেশের ত্রিশ হাজার শিশুকে প্রতিরোধযোগ্য এই প্রতিবন্ধকতার হাত থেকে ফিরিয়ে স্বাভাবিক জীবন উপহার দিয়েছে।
মুগুর পায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি এ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে ওয়াক ফর লাইফ ময়মনসিংহ জেলার উপজেলা সমূহে বিভিন্ন সচেতনতা মূলক ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালিত করে। এছাড়াও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষে “সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালে অর্থোপেডিক সার্জন, চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য ক্লাবফুট এর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কমসূচী আয়োজন করে থাকে। ক্লাবফুট বা “মুগুর পা” নিয়ে জন্মানো কোন শিশুকে যেন সুচিকিৎসার অভাবে প্রতিবন্ধী জীবনের শিকার না হতে হয় এবং বাংলাদেশে ক্লাবফুট নিয়ে জন্মানো সকল শিশুদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও তথ্যদানের ম্যাধমে জন্মেও পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিশ্চিত করাই ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পটির মূল লক্ষ”। তাই আসুন, সচেতন হই, এখন সময়। জন্মের সাথে সাথে ক্লাবফুট শিশুদের পনসেটি পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিশ্চিত করি।

