সুমন ভৌমিকঃ একদিকে যখন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ দূষণ রক্ষার জন্য ছুটে চলছে বিশ্ব নেতাদের কাছে, অন্যদিকে ময়মনসিংহে বায়ুু দূষণ, পরিবেশ দূষণ ও নদী দূষণে মেতে উঠেছে একটি মহল। সবকিছুই চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। এমনই একটি কারখানা কোন অনুমতি ছাড়াই চলছে ময়মনসিংহ নগরীর প্রবেশ মুখে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘেঁষা চায়না মোড় মটকিভাঙ্গা ব্রীজের পাশে। ব্রীজ হওয়ার পর থেকে এখানে একটি মহল অবৈধ ভাবে এসিড ও ড্রাই ব্যাটারি গলানো কারখানা গড়ে তুলেছে। সরকার আসে সরকার যায়, এদের শুধু হাত বদলায়। সকলকে ম্যানেজ করে দিন দিন এটা বৃহৎ আকার ধারণ করছে। কিছুদিন পর পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে ধরা পড়লেও জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়। কিন্তু এটি বন্ধ হয়নি আজ পর্যন্ত। একবার ভেবে দেখেছেন কি? যারা এই নগরীকে ভালবাসেন, দেশকে ভালোবাসেন। আগামী প্রজন্ম কি পাবে বা কি রেখে যাচ্ছি নতুন প্রজন্মের কাছে।
ইতিহাসের সেই পরশুরামের কুঠারের আঘাতে তৈরি পরিশুদ্ধ জলধারা আমাদের এই ব্রহ্মপুত্র নদ। ব্রহ্মপুত্র নদের জলধারা থেকে এখন বিষ ধারায় পরিণত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে আশে পাশের ফসলি জমি ও মাছের প্রজনন। এখানে কৃষকরা পাচ্ছেনা ভালো ফসল, মাছ নির্ভর পরিবারগুলো হারাচ্ছে মাছের অভয়ারন্য। পেশা বদলাতে হচ্ছে তাদের। আর এই ব্যাটারী রিসাইক্লিং এর কালো ধোঁয়ায় ঘরে টেকা দায়। শিশু-বয়োবৃদ্ধরা অস্থির হয়ে পড়েছে। যখন এই কাজ হয় তখন বাড়িতে থাকা যায় না। অনেকে এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়েছেন।
কিশোরগঞ্জের ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধি আব্দুল মোতালেব ময়মনসিংহে বদলী জনিত কারনে এই এলাকায় কম মূল্যের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আসার পর স্ত্রী-সন্তানের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকতো এই দুর্বিসহ পরিস্থিতির কারনে। এখন বাসা বদলে নদের এপারে পাটগুদাম এলাকায় একটু বেশি ভাড়ায় বাসা নিয়ে থাকতে হচ্ছে।
মটকিভাঙ্গা ব্রীজের পাশে খেউড়ি জাল নিয়ে বসে থাকা ষার্টোদ্ধ সামছু মিয়া জানান, এখান থেকে কতো মাছ ধরছি। এখন আর মাছ পাওয়া যায়না। মাছ ধরা পড়লেও সেখানে মাছে রোগ দেখা যায়। খেলে আবার কোন রোগ হয় কিনা এভেবে ফেলে দিতে হয়। এখন মাছ কমে গেছে। বাবা-দাদারা অনেক মাছ ধরছেন, আমরা খাইছি, বিক্রিও করেছি। এখনতো পেশাই বদলাতে হচ্ছে।
এ বয়সে কোন পেশায় যাবো, ছেলে-বৌ নিয়ে কোথায় যাই আমরা। শুধু তাই-নয় সরকারের বিভিন্ন মহলে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার মিলছেনা বলে যানান এলাকাবাসি।
এ নিয়ে ব্যাটারী রিসাইক্লিং প্রতিষ্টান ব্যবসায়ী মোশারফ মন্ডল এর সাথে কথা হলে তিনি অকপটে জানান, আমরা সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরগুলোকে ম্যানেজ করে থাকি। বৈধ কাগজ ও ব্যবসায়ী স্বীকৃতি লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব এর সাধারণ সম্পাদককের মোবাইলে কল করে ধরিয়ে দেন। তবে প্রতিবেদকের সাথে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব এর সাধারণ সম্পাদককের কোন কথা হয়নি। ঐ ব্যবসায়ী কি নিজেকে আঁড়াল করার জন্য এমন করলেন ?
বাংলাদেশ নদী বাচাঁও আন্দোলন ময়মনসিংহ জেলার সাধারন সম্পাদক এডভোকেট এটি এম মাহবুব আলম বলেন, ময়মনসিংহবাসীর অহংকার-গর্ব এই ব্রহ্মপুত্র নদ। এর কোল ঘেঁষে নির্মান হয়েছে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান। এদের বর্জ্য সরাসরি নদের পানিতে ফেলে নদের পানি নষ্ট করছে। এতে জলজ উদ্ভিদসহ মাছ নষ্ঠ হচ্ছে। মাছগুলো পরিবেশ না পেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে বা মরে যাচ্ছে। এই সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির ইটিপি প্ল্যান্ট থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ নেই। ওরা ম্যানেজ করে চলছে। আমরা বারবার প্রশাসন ও পরিবেশ কমকর্তাদের সাথে কথা বলেছি, কিন্তু কাজ হচ্ছেনা। আমরাও থেমে নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ ডেপুটি ডিরেক্টর মিহির লাল সরদার জানান, ২৭ অক্টোবর একটি অভিযান করা হয় অবৈধ স্থাপনা ও শিল্প কারখানার বিরুদ্ধে। র্যাব, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট সহ অভিযান চলানো হয় কিন্তু মালিককে না পাওয়ায় সিনিয়র সহ-কমিশনার মোঃ মঈনুদ্দিন পরিবেশ আইন ভঙ্গ করায় ১৯৯৫ পরিবেশ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। তাহা ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানায় তদন্তদীন আছে।
কোন অভিযোগ আবারও পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ময়মনসিংহে লাইসেন্সধারী এ রকম কোন প্রতিষ্ঠান নেই। আর পরিবেশ দূষণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।
বহু বছর ধরে অবৈধ ভাবে চলা এই ব্যাটারী রিসাইক্লিং শিল্প প্রতিষ্ঠান সরিয়ে অন্যত্র না নিলে ময়মনসিংহের ঐতিহ্য ব্রহ্মপুত্র নদ হুমকির মুখে রয়েছে। ঐতিহ্য বিলিন রোধে, এর মাছ ও পরিশুদ্ধ জলধারা ফিরিয়ে আনতে এখই ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। ময়মনসিংহ নগরবাসীর দাবী ব্রহ্মপুত্র নদের দূষণ রোধ করা, ফিরিয়ে আনা ব্রহ্মপুত্রের পরিশুদ্ধ জলধারা এবং মাছসহ জলজ পরিবেশ। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরকে আরো কঠোর হওয়ার আহবান জানান সচেতন মহল।

