মানব কঙ্কাল

Date:

মানবদেহের ভেতরে থাকা শক্ত হাড়গুলো আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়াতে, হাঁটতে এবং চলতে সাহায্য করে। আপনি হয়তো জানেন না, হাড়গুলো জীবন্ত টিস্যু। এদের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। তা হলো কোনো হাড় ভেঙে বা ফেঁটে গেলে নিজ থেকেই জোড়া লেগে যায়।

আমাদের দৈনন্দিক কার্যকলাপের জন্য এবং দৈহিক নিয়মে দেহের হাড়গুলো নিয়মিত ক্ষয় হচ্ছে এবং নিজেদের গঠন করছে। এই প্রক্রিয়াটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রিমডেলিং’। আসুন মানবদেহের হাড় বা কঙ্কাল সম্পর্কে এমন অদ্ভুত এবং অজানা ৬টি তথ্য জেনে নিই।

সব মানুষের ২০৬টি হাড় থাকে না: 

সেই ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ে আমরা পড়েছি- মানবদেহে হাড়ের সংখ্যা ২০৬টি। কিন্তু শিশুরা ৩০০টিরও বেশি হাড় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই হাড়গুলো রুপান্তরিত হয় এবং কিছু হাড় একেবারেই ক্ষয় হয়ে দেহে খনিজ সরবরাহ করে। কিছু মানুষ আছেন যারা পাঁজরে ১৩ জোড়া হাড় অর্থাৎ অতিরিক্ত এক জোড়া হাড় নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। এবং আমৃত্যু এই হাড় তাদের পাঁজরেই থাকে। আবার এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের শরীরে যেকোনো বয়সে অতিরিক্ত হাড়ের বিকাশ ঘটে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক অনেক মানুষের হাঁটুর পেছনের অংশে শিমের দানার মতো ছোট্ট একটা হাড় গজায়। উন্নতমানের পুষ্টিযুক্ত খাবার গ্রহণকারী এবং অতিরিক্ত ওজনওয়ালা মানুষদের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটি বেশি ঘটে।

কঙ্কালের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ে: শিশু বয়সে মানুষের হাড়গুলো সবচেয়ে দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কৈশোরের শেষের দিকে এসে একটা আদর্শ উচ্চতায় পৌঁছে উচ্চতা বৃদ্ধির হার একরকম প্রায় থেমেই যায়। তবে একটা নির্দিষ্ট বয়সে এসে আমাদের হাড়গুলোর বৃদ্ধি থেমে গেলেও আমাদের উচ্চতা যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। মানবদেহের দুইটি হাড়ের মিলনস্থলে কার্টিলেজ নামক স্তর থাকে। এই স্তরটি শক্ত জেলির ন্যায় একগুচ্ছ টিস্যু যা পানি, কোলোজেন, প্রোটোগ্লাইক্যানস দিয়ে গঠিত।

মানবদেহের এই কার্টিলেজগুলো মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হয়, বিশেষ করে মেরুদণ্ডের কার্টিলেজ। এজন্যই শুয়ে থাকলে নিজেকে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে কিছুটা খাটো মনে হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকার পর কার্টিলেজগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। মহাকাশে অবশ্য এর উল্টোটা ঘটে। নভোচারীদের দেহের কার্টিলেজগুলো স্ফিত হয়ে যায় এবং গড়ে স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে তাদের প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

মানবদেহের একমাত্র বিচ্ছিন্ন হাড়: আমরা প্রায় সবাই জানি যে, মানবদেহের সবগুলো হাড় একে অপরের সাথে সংযুক্ত। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ‘হায়োড’ নামক হাড়টি মানবদেহের একমাত্র বিচ্ছিন্ন হাড় যা অন্য কোনো হাড়ের সাথে সংযুক্ত নয়। ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’ আকৃতির এই হাড়টির অবস্থান জিহ্বার গোড়ায়। উপরে মাথার খুলি, চোয়ালের গোড়ার পেশী এবং লিগামেন্টের শক্ত সংযোগের কারণেই এই হাড়টি স্থির থাকে।

হাড়টির এমন অবস্থানের কারণে এটি ভাঙার ঘটনা খুবই বিরল। তবে বেশ কিছু ময়নাতদন্তে গলায় ফাঁস দিয়ে মৃত্যুবরণ করা অথবা গলা টিপে হত্যা করা মানুষের হায়োড হাড় ভাঙা বা ফেটে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। হাড়টি আমাদের কথা বলতে, শ্বাস-প্রশ্বাসে এবং খাবার গিলতে সাহায্য করে।

অস্থিমজ্জার বহুবিধ কার্যাবলি: উরুর হাড়ের মতো লম্বা হাড়গুলো ফ্যাট কোষ, রক্তকোষ এবং ইমিউন কোষ দ্বারা তৈরি অস্থিমজ্জাতে পরিপূর্ণ থাকে। শিশুদের অস্থিমজ্জা সাধারণত লাল রঙের হয় এবং এগুলো শিশুদের শরীরে রক্তকণিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের অস্থিমজ্জা হলুদ বর্ণের হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের মোট ফ্যাটের ১০ শতাংশই ধারণ করে অস্থিমজ্জা। এতোদিন ধরে অস্থিমজ্জার হাড়ের ভেতরের ফাঁপা জায়গার স্পেস ফিলার হিসেবেই গণ্য করা হতো। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, হাড়ের ভেতরের এই ফ্যাটগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিপাক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে এবং অন্তঃস্রাবকে কার্যকর করে।

মানবদেহের ক্ষুদ্রতম হাড়: মানবদেহের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম হাড় হলো ম্যালিয়াস, ইনসাস এবং স্ট্যাপস। এই হাড়গুলোকে একত্রে অসিক্লেস (লাতিন ভাষায় ‘ক্ষুদ্র হাড়গুচ্ছ’) নামে পরিচিত। এই হাড়গুলো বাতাস থেকে শব্দতরঙ্গ আলাদা করে তা শ্রবণের জন্য কানের তরল অংশে পাঠায়। এই হাড়গুলোই একমাত্র হাড় যেগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর আর কোনো রকম পরিবর্তিত হয় না। মানবদেহের জন্য এই হাড়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আকার বা আকৃতি সামান্যতম পরিবর্তন হলেও শ্রবণ শক্তির বিরাট পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ফরেনসিক গবেষকদের জন্য হাড়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ হাড়গুলো মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই গঠিত হয়।

মানসিক চাপে হাড়ের প্রভাব: মানবদেহের সহানুভূতিশীল স্নায়ুতন্ত্রগুলো যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো প্রক্রিয়াকে সামাল দেয়ার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। একে ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ রেসপন্স বলা হয়। মানসিক চাপে থাকাকালীন এ ধরনের রেসপন্সের কারণে এড্রোনালিন হরমোন নিঃসরিত হয়। তবে সম্প্রতি গবেষকরা স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার মূল খেলোয়াড় হিসেবে অস্থি গঠনকারী কোষে থাকা হরমোন অস্টিওক্যালসিনের ব্যাপক ভূমিকার কথা জানতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা মানুষের অস্টিওক্যালসিন স্তর পরীক্ষা করে দেখেছেন, মানসিক চাপে থাকাকালীন এর প্রভাবে রক্ত এবং প্রস্রাবের মাত্রা বেড়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

Subscribe

spot_imgspot_img

Popular

More like this
Related

গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সম্প্রতি জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের...

ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে অবস্থিত...

ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী

একাত্তর বাংলা রিপোর্টঃ ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পৃথক...

বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত

মাসুদ উল হাসান ॥ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়...
LATEST NEWS
গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক শহীদকে জড়িয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ময়মনসিংহে উদ্দীপন কুমির খামার পরিদর্শন করেছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা শাখার দুটি অভিযানে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩ মাদক ব্যবসায়ী বকশীগঞ্জ হাসপাতাল ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করেই তড়িগতিতে স্টিল আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে-এমপি ওয়াহাব আর্ন্তজাতিক মানের বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও বিকেএসপি নির্মাণ হলে খেলাধূলার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে-এমপি ওয়াহাব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল-তথ্য প্রতিমন্ত্রী চৌকস ওসি নাজমুস সাকিব এর নেতৃত্বে শাওন হত্যার আসামীরা গ্রেফতার ময়মনসিংহে হতদরিদ্রদের মাঝে নবনির্বাচিত এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দের ইফতার বিতরণ বিএনপি হচ্ছে সে রকম একটি দল-যাদের পরিকল্পনা রয়েছেঃ তারেক রহমান